পীরে ত্বরিকত হযরত মুহাম্মদ আজাদ খান চিশতী আল-মুজাদ্দেদী (মুঃজিঃআঃ): বাংলার মুসলমান সমাজের অন্যতম প্রাচীন ও মহিমান্বিত উৎসব হলো ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)। মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা দয়ার নবীজান (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে এই উৎসব শত শত বছর ধরে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির এক বিশেষ অংশ হয়ে আছে।
আজ আমরা যেমন বর্ণাঢ্য জুলুস,আলোকসজ্জা, মিলাদ-মাহফিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ দিনটি পালন করি,শত বছর আগেও বাংলার মুসলমানেরা গভীর শ্রদ্ধা ও আনন্দের সাথে এই দিবস উদযাপন করতেন।
কারা প্রথম জশনে জুলুস শুরু করেছিলেন?
আজকের দিনে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান নিজেদেরকে বাংলার যমিনে প্রথম জশনে জুলুসের প্রবর্তক বলে দাবি করে থাকে।
কারো মতে,
১৯৫৭ সালে শায়খুল হাদীস হজরত নুরুসসফা নঈমী (রহ.) সর্বপ্রথম জুলুস বের করেছিলেন।
আবার কেউ বলেন,
১৯৬৩ সালে হজরত ইদ্রিস রজবী (রহ.) কিংবা ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের পীর হজরত সিরিকুটি (রহ.) জুলুসের নেতৃত্ব দেন।
অনেকে দাবি করেন,
হজরত আবেদ শাহ মোজাদ্দেদী (রহ.) ১৯৭৩ সালেই প্রথম জুলুস বের করেছিলেন।
এর বাইরেও আরেকটি প্রচলিত মত হলো দেওবন্দী কওমী আলেমদের সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ “জুলুসে মুহাম্মাদী” নামে সর্বপ্রথম জুলুস বের করেছিল তবে সেটা বাংলার যমিনে নই,যার ইতিহাস শত বছর পেরিয়ে গেছে।
কিন্তু এসব দাবি ইতিহাসের দলিল ও প্রমাণ দ্বারা
বাংলার মাটিতে মিলাদের সর্বপ্রথম জুলুস প্রমাণিত নয়।
বরং নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়,বাংলার জমিনে সর্বপ্রথম মিলাদুন্নবী(স.)-র জুলুসের প্রবর্তক হিসাবে দুইটি নাম পাওয়া যাই,তা হলো
খলিফায়ে ফুরফুরা,
ওলীয়ে কামেল আল্লামা আহমাদ আলী হামিদ জালালী ওয়েসী(রাদ্বী.)১৯২৩ সালে
ও
বিশ্বখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ১৮ ভাষার পন্ডিত ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (রাদ্বী.) ১৯২৮ সালে।
◾আল্লামা আহমাদ আলী হামিদ জালালী(রাদ্বী.)র প্রবর্তিত প্রথম জুলুস◾
সমাজ সংস্কার ও তাসাউফের প্রচারের উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম ১৯২৩ সালে হালকায়ে যিকরের আকারে জুলুসের প্রচলন করেন ফুরফুরা পীর মুজাদ্দিদে যামান সৈয়্যেদুনা ইমাম আবু বকর সিদ্দিকী আল কুরাইশী দাদা হুজুর পীর কেবলা (রাদ্বী:আনহু)-এর অন্যতম প্রধান খলিফা শাহ সূফী পীর আল্লামা আহমাদ আলী হামিদ জালালী ওয়েসী(রাদ্বী:আনহু)।
ফুরফুরা শরীফের মহান পীর শায়খুল ইসলাম,কুতুবুল আলম,আমিরুশ শরিয়াত,মুজাদ্দিদুয যামান হজরত পীর শাহ সুফি মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকী আল কুরাইশী ফুরফুরাবী দাদা পীর সাহেব কেবলা (রাদ্বী:আনহু) যখন সীতাপুরে কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হন,
সেই সময়ে শায়খ হামিদ জালালী সাহেব কেবলা ফুরফুরা ফাতহিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন।
(এ সম্পর্কে হাফিজুল হাদিস আল্লামা রুহুল আমিন বশিরহাটি রাদ্বীআল্লাহু আনহু তার লিখিত গ্রন্থ দাদা পীর সাহেব কেবলার বিস্তারিত জীবনীতে “কলিকাতার খলিফা” অধ্যায়ে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন)
ঐ সময়ে আল্লাহর তরফ থেকে হামিদ জালালী পীর সাহেবের অন্তরে হালকায়ে যিকরের এক বিশেষ প্রেরণা উদয় হয়।
তখন তিনি ফাতহিয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্যাজ ও নিশান দ্বারা সুসজ্জিত করে নিজে তাদের নিয়ে জুলুসের আকারে সীতাপুরে অসুস্থ পীর সাহেবের খেদমতে উপস্থিত হন।
এ সম্পর্কে আল্লামা আহমাদ আলী হামিদ জালালী (রাদ্বী:আনহু) নিজেই লিখেছেন যে,
“ফুরফুরার হজরত পীর সাহেব যে সময় সীতাপুরে কঠিন অসুস্থ,
আমি তখন ফুরফুরা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করি। সেই সময়ে আল্লাহর তরফ থেকে হঠাৎ এক চিন্তার ধারা আমার অন্তরে জেগে ওঠে এবং যিকরের এই পার্টি গঠনের প্রেরণা লাভ করি।
তখন আমি মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্যাজ নিশান দ্বারা সুসজ্জিত করে তাদের নিয়ে ফুরফুরা থেকে সীতাপুরে হুজুর মরহুমের খেদমতে পৌঁছাই।
তখন প্রায় রাত নয়টা।
আহা!
কী মনোরম চাঁদের আলোয় যখন ছাত্ররা শের-আশ’আর মধুর সুরে পড়তে পড়তে,
নারায়ে তাকবির বলতে বলতে জুলুসের আকারে যাচ্ছিলেন,
সে দৃশ্য যেন নূরের ঝলকানি ছিল।
(দিওয়ানে জালালী বইয়ের শের নং ১০ দেখুন,আমরা এই পোস্টের কমেন্ট ১০ নং শেরের সাথে বেশ কয়েকটি জালালী হুজুর কেবলার লেখা কয়কটি শের উল্লেখ করেছি)।
মুজাদ্দিদুয যামান দাদা পীর সাহেব কেবলা সেই দৃশ্য একাগ্রচিত্তে শুনে দোয়া করেন এবং ফরমান দেন যে,
“আপনারাও আমার আরোগ্যের জন্য দোয়া করুন।”
এটিই ছিল হালকায়ে যিকর পার্টির প্রথম আবির্ভাব।
এর কিছুদিন পর হামিদ জালালী পীর সাহেবের সঙ্গে ডক্টর মওলানা
মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবের
সাক্ষাৎ হয়
এবং তাঁদের মধ্যে সমাজ ও আর্থিক উন্নয়নের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে তাঁরা একসঙ্গে পান্ডুয়ার আতরালি মিঞার রাইস মিল কার্যালয়ে কাদা-পানি ভেঙে পরিদর্শনে যান।
তাঁদের উদ্দেশ্যগুলো শুনে দাদা পীর সাহেব আন্তরিক দোয়া প্রদান করেন।
বহু বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে অবশেষে ইংরেজি ১৯২৩ সাল থেকে বিভিন্ন স্থানে হালকায়ে যিকরের প্রচার শুরু হয় এবং তা নিয়মিতভাবে স্থাপিত হয়।
সুত্র:
(হালকায়ে যিকর বইয়ের পৃষ্ঠা ৩১-৩২;হজরত শাহ জালালী পীর কেবলার জীবনী বইয়ের পৃষ্ঠা ৩৭-৩৮)।
পরবর্তীতে “আঞ্জুমানে হালকায়ে যিকর ও হেফজুল কোরআন সোসাইটি”-র অক্লান্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলার গ্রামেগঞ্জে মানুষের মধ্যে যিকর ও আধ্যাত্মিকতার জাগরণ ঘটে।
মানুষ আল্লাহ ও রাসূলের প্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে থাকে এবং সমাজে সৎকাজ ও নৈতিকতার চর্চা প্রসারিত হয়।
তবে কিছু সংকীর্ণমনা মৌলভী গোপনে হালকায়ে যিকর সম্পর্কে আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিকর কথা প্রচার করতে থাকে।
কিন্তু নির্ভীক জালালী বাবা পীর কেবলা তাঁদের মোকাবিলা করেন সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে।
তিনি কোরআন ও হাদিসের গভীর জ্ঞানভাণ্ডার থেকে যুক্তি তুলে ধরে বড় বড় ইশতেহার প্রকাশ করেন এবং প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হালকায়ে যিকরের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।
◾বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী মাননীয় এ,কে, ফজলুল হক সাহেব বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে সভাপতির আসন গ্রহণ করেন, ও “হালকায়ে জেকেরের” কমিটি প্রদত্ত অভিনন্দনের প্রতুত্তরে জনাব মন্ত্রী সাহেব চিত্তাকর্ষক বক্তৃতা প্রদান করেন◾
নিখিলবঙ্গ হালকায়ে জেকেরের ত্রয়োদশ বার্ষিক অধিবেশন মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার বেলিয়াঘাটা মেন রোডের হায়দারী ম্যাচ ফ্যাক্টরীর সুবিস্তৃত বাগানবাড়িতে।
দিনটি ছিল ১৮ই ভাদ্র,রবিবার।
অনুষ্ঠানকে ঘিরে গঠিত হয় একটি শক্তিশালী অভ্যর্থনা কমিটি,
যার সভাপতি ছিলেন খান বাহাদুর মওলানা হাজী আহমাদ আলী এনায়েতপুরী এম.এল.এ এবং সেক্রেটারী শায়খ আহমাদ আলী হামিদ জালালী ওয়েসী কেবলা ও মৌলুবী গোলাম সোবহান সাহেব।
অধিবেশনে যোগদান করেন তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাঙ্গলা এ.কে. ফজলুল হক,
স্বরাষ্ট্র সচিব খাজা নাজিমুদ্দিন,মন্ত্রী শহীদ সোহরওয়ার্দি, আজাদ পত্রিকার সম্পাদক মওলানা আকরাম খাঁ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।
বিপুল জনসমাগমে চারটি লাউডস্পিকার স্থাপন করা হয় এবং বেলিয়াঘাটা পুল থেকে সভাস্থল পর্যন্ত পতাকা ও তোরণে সজ্জিত করা হয়।
গেটগুলোকে নাম দেওয়া হয় “গরীব নওয়াজ গেট”, “ফজলুল হক গেট”, “নাজিমুদ্দিন গেট” ও “শহীদ গেট”।
মন্ত্রী ও নেতৃবৃন্দের আগমন বোম্বধ্বনির মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় এবং ভলান্টিয়াররা “আল্লাহু আকবার” ও রাজনৈতিক শ্লোগানে তাঁদের অভ্যর্থনা জানায়।
অনুষ্ঠান শুরু হয় কোরআন তেলাওতের মাধ্যমে।
এরপর অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি মওলানা এনায়েতপুরী ইসলামের উদ্দেশ্য ও হালকায়ে জেকেরের লক্ষ্য নিয়ে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
পরে মুখ্যমন্ত্রী
মাননীয় এ,কে, ফজলুল হক সাহেব বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে সভাপতির আসন গ্রহণ করিলেন, ও “হালকায়ে জেকেরের” কমিটি প্রদত্ত অভিনন্দনের প্রতুত্তরে জনাব মন্ত্রী সাহেব চিত্তাকর্ষক বক্তৃতা প্রদান করেন।
সন্ধ্যায় ওয়াজ মাহফিলে ইসলামের একতা,
সমাজ সংস্কার ও মুসলিম লীগের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়,
যেখানে বহু বক্তা আবেগময় বাণী প্রদান করেন।
অধিবেশনের এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল আয়ারল্যান্ডের নব মুসলিম ফজলুল হক বার্কলীর না’তিয়া কালাম পাঠ,
যা সবাইকে বিমোহিত করে।
সামগ্রিকভাবে এ অনুষ্ঠান মুসলিম সমাজ ও রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
◾এক নজরে শায়খ আহমাদ আলী হামিদ জালালী ওয়েসী(রাদ্বী.)◾
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ,বহু গ্রন্থপ্রণেতা,
আরবী-ফারসী সাহিত্যের অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হজরত আল্লামা কুতুবে যামান,
মেহবুবে রহমান,
শায়খ আহমাদ আলী হামিদ জালালী ওয়েসী (রাদ্বী.) ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ এক আধ্যাত্মিক সাধক ও সুফী।
তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর ফুরফুরা ফতেহিয়া মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বহু যোগ্য ছাত্র সমাজকে গড়ে তুলেছিলেন।
তন্মধ্যে ফুরফুরার কাইয়্যুমুয যামান বড় হুজুর ও মুফতিয়ে আযম মেজ হুজুর পীর সাহেব কেবলাদ্বয়(রাদ্বী.আনহুমা) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ফুরফুরার পীর সাহেব কেবলা তাঁকে কত ভালোবাসতেন তার একটি নিদর্শন হলো নিজের শালক হজরত আব্দুল্লাহর সাহেবের কন্যা তাপসী মোহতারমা জয়নাব বিবির সঙ্গে হজরত শাহ জালালী পীর কেবলাকে বিয়ে দিয়ে পারিবারিক সম্পর্ক করেন।
যেমনভাবে জগৎবিখ্যাত মহাসাধক
মাহবুবে সৈয়্যেদুল মুরসালীন(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম),
কুতুবুল ইরশাদ,
রসূলে নূমা,
পীর হজরত সৈয়্যেদ ফতেহ আলী ওয়েসী (রাদ্বীআল্লাহু তায়ালা আনহু) ফুরফুরার মুজাদ্দিদুয যামান হজরত আবু বকর সিদ্দিকী আল কুরাইশী (রাদ্বী.)-কে স্নেহভরে কাছে রেখে খেলাফত প্রদান করেছিলেন,
তদ্রূপ ফুরফুরার হজরত আবু বকর সিদ্দিকী দাদা পীর সাহেব কেবলাও শাহ জালালী পীর সাহেবকে গভীর স্নেহ ও ভালবাসা দিয়ে নিজের খলিফাদের মধ্যে উচ্চ সম্মান দান করেছিলেন।
হজরত পীর আহমাদ আলী হামিদ জালালী ওয়েসী (রহঃ), যিনি “হামিদ জালালী” বা “জালালী বাবা” নামে সুপরিচিত, ছিলেন আলেমে হাক্কানী ও আরেফে রাব্বানী।
জালালী পীর সাহেব শুধু সুপণ্ডিত ও সুফীই নন,
বরং একজন দরদী সমাজসেবক ও শিক্ষাবিদ হিসেবেও অবিভক্ত বাংলাসহ সমগ্র ভারতে খ্যাতি অর্জন করেন।
তিনি আরবী, ফারসী ও উর্দু ভাষায় বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং অসংখ্য কবিতা,নাত ও সাহিত্যকর্ম লিখেছেন।
তাঁর বিখ্যাত কিতাবসমূহ হলো-
১. লায়ালী সিদ্দিকীয়া
২. সাইফুল্ গওসিল আযম আলা আ’নাকি আশরারে আলম
৩. তাফসিলুল উমম
৪. মিলাদে মুস্তাফা
৫. মেরাজে মুজতাবা
৬. জামে হায়াত আবে জিন্দেগী
৭. হালাকায়ে জিকির
৮. রজমুল ওয়াস ওয়াসিল খান্নাস ফি সুদুরিন্নাস
৯. দিওয়ান-এ (হামিদ) জালালী
তার খিদমত প্রমাণ করে যে হজরত আহমাদ আলী হামিদ জালালী ওয়েসী (রাদ্বী.) ছিলেন যুগের কুতুব, একজন মহৎ আলেম,সুফী ও সমাজ সংস্কারক।
⚫ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর প্রবর্তিত প্রথম জুলুস
এবার আসুন ভাষা সৈনিক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ(রাদ্বী.)র প্রবর্তিত প্রথম জুলুস সম্পর্কে জানতে পারি ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী,
১৯২৮ সালে প্যারিস থেকে দেশে ফিরে ড. শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করেন নবীজী(দরূদ)-এর জন্মদিনকে আরও ব্যাপকভাবে পালনের জন্য।
তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ থেকে সর্বপ্রথম ঈদে মিলাদুন্নবীর জুলুস বের হয়।
এটি শহরের কয়েকটি এলাকা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসে।
এভাবেই বাংলার মাটিতে প্রথম আনুষ্ঠানিক জশনে জুলুস প্রবর্তিত হয়,
যা পরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এই উদ্যোগ শুধু ধর্মীয় আবেগের প্রকাশই নয়,
বরং একপ্রকার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন হিসেবেও কাজ করেছিল।
◾বাংলার ইতিহাসে নবাবি আমলেও মিলাদুন্নবী অত্যন্ত ধুমধামের সাথে পালিত হতো।
ঐতিহাসিক কে.পি. সেন তাঁর বাংলার ইতিহাস নবাবী আমল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে,
মুর্শিদাবাদের নবাবরা রবিউল আউয়ালের প্রথম বারো দিন ধরে বিশাল উৎসব আয়োজন করতেন।
ভাগীরথীর তীর পর্যন্ত শহর আলোকসজ্জায় ঝলমল করত,কামানের আওয়াজে চারদিক মুখরিত হতো,
লক্ষাধিক মানুষ শুধু আলোকসজ্জার কাজেই নিয়োজিত থাকত।
◾ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহও পিছিয়ে ছিলেন না।
তিনি প্রতিটি পাড়ায়-পাড়ায় মিলাদ মাহফিল আয়োজনের জন্য আর্থিক সহায়তা দিতেন।
তাঁর উদ্যোগেই “ভাটিয়ালী মৌলুদ” নামে বিশেষ সুরে মিলাদ পাঠের প্রচলন হয়।
চক মসজিদের আশেপাশে আলোকসজ্জা,সমবেত মিলাদ পাঠ ও বিশাল ভোজ ছিল নিয়মিত আয়োজন।
◾ঈদে মিলাদুন্নবী শুধু মুসলিম সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
অনেক হিন্দু শিক্ষক-ছাত্রও এই উৎসবে যোগ দিতেন।
ঔপন্যাসিক আবু রুশদ তাঁর স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেছেন যে,
এক স্কুলের মিলাদ অনুষ্ঠানে মুসলিম শিক্ষামন্ত্রীর পাশাপাশি হিন্দু প্রধান শিক্ষক বিজয় কৃষ্ণ ভট্টাচার্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
হিন্দু ছাত্ররাও উৎসবে যোগ দিত,যদিও মোনাজাতে অংশ নিত না।
এই উদাহরণ প্রমাণ করে যে,
মিলাদুন্নবী বাংলার সমাজে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছিল।
◾শুধু নবাবরাই নয়,
সাধারণ স্কুল-কলেজের মুসলিম ছাত্রদের কাছেও মিলাদুন্নবী ছিল এক বিশাল উৎসব।
সিলেট গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে ছাত্ররা নিজেদের বাড়ি সাজাত,নবীর জীবনী পাঠ করত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া,কুষ্টিয়া,নারিকেল ডাঙ্গা,তালতলা এসব জায়গায় ছাত্ররা মিলাদ মাহফিল আয়োজন করত এবং কবি-সাহিত্যিকদেরও আমন্ত্রণ জানাত।
বিখ্যাত সাহিত্যিক সুফিয়া কামাল লিখেছেন,
তখন বারো দিন ধরে মিলাদ হতো,
ভোজের আয়োজন থাকত,
গরিব পরিবারগুলো বিশেষ খাবার ও উপহার পেত। অর্থাৎ,
এ উৎসব ছিল দাওয়াত,দান ও সামাজিক মিলনের এক মহামঞ্চ।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ(রা.)-র নেতৃত্বে শুরু হওয়া জুলুস আজ শতবর্ষ অতিক্রম করেছে।
সেই সময় যেমন মসজিদ সাজানো,
সমবেত কণ্ঠে মিলাদ পাঠ,
ছাত্র-যুবকদের উদ্যোগ,
দাওয়াত ও ভোজ,
আর জুলুস ছিল মিলাদুন্নবীর অবিচ্ছেদ্য অংশ আজও আমরা একই ধারা অনুসরণ করি।
শুধু আয়োজনের পরিসর বেড়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে মিলাদুন্নবী জাতীয় পর্যায়ে পালিত হয়।
সরকারি ছুটি থাকে,লাখো মানুষ জুলুসে অংশ নেয়,
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
অতএব,
ইতিহাসের আলোকে পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, বাংলার যমিনে সর্বপ্রথম ঈদে মিলাদুন্নবীর জুলুস প্রবর্তন করেছিলেন খলিফায়ে ফুরফুরা হজরতগণ।
ফুরফুরা শরীফের খলিফাদের হাত ধরে বিশেষ করে শায়খ আল্লামা আহমাদ আলী হামিদ জালালী(রাদ্বী.)র মাধ্যমে বাংলার সমাজে গ্রামে গ্রামে হালকায়ে যিকরের নামে জুলুসের প্রচলন ঘটে এবং এটি আধ্যাত্মিক জাগরণ ও সমাজ সংস্কারের এক অনন্য মাধ্যম হয়ে ওঠে এবং
ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (রাদ্বী.)র উদ্যোগেও মিলাদুন্নাবী(দরূদ)উপলক্ষে জশনে জুলুস বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয়,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং আজও তা আমাদের ঐতিহ্যের গর্বিত অংশ হয়ে আছে।
তথ্যসূত্রঃ
১. কে. পি. সেন,বাংলার ইতিহাস নবাবী আমল, কলিকাতা,১৩০৮ বঙ্গাব্দ
২. মুহম্মদ সিদ্দিক খান,রচনাবলী (প্রথম খণ্ড),বাংলা একাডেমি, ১৯৯৪
৩. সৈয়দ মুর্তাজা আলী,আমাদের কালের কথা,চট্টগ্রাম,১৩৭৫ বঙ্গাব্দ
৪. কামরুদ্দীন আহমদ,বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ,ধ্রুপদ সাহিত্যাঙ্গন,২০১১
৫. শওকত ওসমান,রাহনামা (২য় খণ্ড),সময় প্রকাশনী,২০০৭
৬. আবু রুশদ,জীবন ক্রমশ ঠিকানা পশ্চিম এখন বর্তমান,অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ১৯৯৮
৭. সানাউল হক,রচনাবলী (২য় খণ্ড),বাংলা একাডেমি, ২০০২
৮. সা’দ আহমদ,আমার দেখা সমাজ ও রাজনীতির তিনকাল,রিজিয়া সা’দ ইসলামিক সেন্টার,২০০২
৯. সুফিয়া কামাল,একালে আমাদের কাল,বাংলা একাডেমি
১০. মাহ্যূযা হক,মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্,পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন,ঢাকা,১৯৯১
১১.হজরত শাহ জালালী পীর কেবলার জীবনী, পৃ. ৩৭-৩৮/৪৫-৪৬-৪৭
১২.হালকায়ে যিকির,পৃ.৩১-৩২


























