ঢাকা ০৬:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিলিয়ন ডলারের আমদানি পণ্যের ৫টিই জ্বালানি

বিলিয়ন ডলারের আমদানি পণ্যের ৫টিই জ্বালানি

বাংলাদেশের পণ্য আমদানির চিত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন আমদানি ব্যয়ে শীর্ষে থাকা তুলাকে পেছনে ফেলেছে ডিজেল। ফলে প্রথমবারের মতো দেশের পণ্য আমদানিতে শীর্ষে উঠে এসেছে এই জ্বালানি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্রে পরিবর্তন দেখা যায়। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৬টি কাস্টমস স্টেশন দিয়ে বিপুল পণ্য আমদানি হয়েছে। তবে ১১টি পণ্যের প্রতিটির আমদানি মূল্য এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

আমদানির শীর্ষে ডিজেল

দীর্ঘদিন ধরে আমদানি ব্যয়ের প্রথম অবস্থানে ছিল বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তুলা। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পর এবার সেই স্থান দখল করেছে ডিজেল। ফলে দেশে পণ্য আমদানিতে ডিজেলের ব্যবহার ও খরচ দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় ৩৩১ কোটি ডলারের ডিজেল আমদানি হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা তুলার আমদানি মূল্য ছিল প্রায় ৩০৭ কোটি ডলার। ফলে তুলার চেয়ে ডিজেল আমদানিতে প্রায় ২৪ কোটি ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে।

তুলা আমদানিতে ব্যয় হ্রাস

আগের অর্থবছরে ডিজেলের স্থান ছিল চতুর্থ। তবে এবার আমদানির পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টন বেড়ে ৩৮ লাখ ৮০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। ফলে ডিজেলের সামগ্রিক আমদানি খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে বিদায়ী অর্থবছরে তুলার আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের অর্থবছরে তুলা আমদানিতে ৩৪৫ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। তবে এবার তা কমে ৩০৭ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি

আমদানি পণ্যে ডিজেল শীর্ষে ওঠার পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতির বড় প্রভাব রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।

এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ওপর।

জ্বালানি খাতের বিশাল দাপট

বর্তমানে বিলিয়ন ডলারের ১১টি পণ্যের মধ্যে ৫টিই জ্বালানি খাতের। ডিজেল, এলএনজি, কয়লা, এলপিজি ও অপরিশোধিত তেল আমদানিতে মোট ১০.১৯ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।

দেশের মোট ঘোষিত ৭৩.১২ বিলিয়ন ডলার আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশই এই পাঁচ পণ্যের দখলে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় জ্বালানি আমদানির পেছনে এত বিশাল অর্থ ব্যয় হয়েছে।

শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য

জ্বালানির পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যও তালিকায় বড় জায়গা ধরে রেখেছে। স্ক্র্যাপ বা পুরোনো লোহা আমদানিতে ২০৮ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে।

এছাড়া গম আমদানিতে ২০৫ কোটি, পাম তেলে ১৬৫ কোটি এবং সয়াবিনবীজে ১০৭ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি খাতের ডিএপি সার আমদানিতে ১৩৬ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে।

পাঁচ বছরের ব্যবধানে আমদানির পরিবর্তন

২০২০-২১ অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য ছিল ১০টি। তখন এসব পণ্যে মোট ১৫.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল।

পাঁচ বছর পর পণ্য সংখ্যা বেড়ে ১১টিতে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মোট ব্যয় ৩৭ শতাংশ বেড়ে ২১.৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের তালিকা থেকে ক্লিংকার ও ফার্নেস অয়েল বাদ পড়েছে। তবে নতুন করে কয়লা, ডিএপি সার ও এলপিজি যুক্ত হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতামত

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি তালিকায় জ্বালানির প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি আমদানিতে খরচ বাড়ায় দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তবে কাঁচামাল আমদানি শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখবে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিলিয়ন ডলারের আমদানি পণ্যের ৫টিই জ্বালানি

আপডেট সময় : ০৩:২৪:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের পণ্য আমদানির চিত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন আমদানি ব্যয়ে শীর্ষে থাকা তুলাকে পেছনে ফেলেছে ডিজেল। ফলে প্রথমবারের মতো দেশের পণ্য আমদানিতে শীর্ষে উঠে এসেছে এই জ্বালানি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্রে পরিবর্তন দেখা যায়। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৬টি কাস্টমস স্টেশন দিয়ে বিপুল পণ্য আমদানি হয়েছে। তবে ১১টি পণ্যের প্রতিটির আমদানি মূল্য এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

আমদানির শীর্ষে ডিজেল

দীর্ঘদিন ধরে আমদানি ব্যয়ের প্রথম অবস্থানে ছিল বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তুলা। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পর এবার সেই স্থান দখল করেছে ডিজেল। ফলে দেশে পণ্য আমদানিতে ডিজেলের ব্যবহার ও খরচ দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় ৩৩১ কোটি ডলারের ডিজেল আমদানি হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা তুলার আমদানি মূল্য ছিল প্রায় ৩০৭ কোটি ডলার। ফলে তুলার চেয়ে ডিজেল আমদানিতে প্রায় ২৪ কোটি ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে।

তুলা আমদানিতে ব্যয় হ্রাস

আগের অর্থবছরে ডিজেলের স্থান ছিল চতুর্থ। তবে এবার আমদানির পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টন বেড়ে ৩৮ লাখ ৮০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। ফলে ডিজেলের সামগ্রিক আমদানি খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে বিদায়ী অর্থবছরে তুলার আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের অর্থবছরে তুলা আমদানিতে ৩৪৫ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। তবে এবার তা কমে ৩০৭ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি

আমদানি পণ্যে ডিজেল শীর্ষে ওঠার পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতির বড় প্রভাব রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।

এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ওপর।

জ্বালানি খাতের বিশাল দাপট

বর্তমানে বিলিয়ন ডলারের ১১টি পণ্যের মধ্যে ৫টিই জ্বালানি খাতের। ডিজেল, এলএনজি, কয়লা, এলপিজি ও অপরিশোধিত তেল আমদানিতে মোট ১০.১৯ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।

দেশের মোট ঘোষিত ৭৩.১২ বিলিয়ন ডলার আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশই এই পাঁচ পণ্যের দখলে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় জ্বালানি আমদানির পেছনে এত বিশাল অর্থ ব্যয় হয়েছে।

শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য

জ্বালানির পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যও তালিকায় বড় জায়গা ধরে রেখেছে। স্ক্র্যাপ বা পুরোনো লোহা আমদানিতে ২০৮ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে।

এছাড়া গম আমদানিতে ২০৫ কোটি, পাম তেলে ১৬৫ কোটি এবং সয়াবিনবীজে ১০৭ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি খাতের ডিএপি সার আমদানিতে ১৩৬ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে।

পাঁচ বছরের ব্যবধানে আমদানির পরিবর্তন

২০২০-২১ অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য ছিল ১০টি। তখন এসব পণ্যে মোট ১৫.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল।

পাঁচ বছর পর পণ্য সংখ্যা বেড়ে ১১টিতে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মোট ব্যয় ৩৭ শতাংশ বেড়ে ২১.৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের তালিকা থেকে ক্লিংকার ও ফার্নেস অয়েল বাদ পড়েছে। তবে নতুন করে কয়লা, ডিএপি সার ও এলপিজি যুক্ত হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতামত

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি তালিকায় জ্বালানির প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি আমদানিতে খরচ বাড়ায় দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তবে কাঁচামাল আমদানি শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখবে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হবে।