ঢাকা ০১:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেসরকারিভাবে নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে সাড়া নেই পুলিশের

সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটি মিনিটই পরিবারের কাছে অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠার। নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে দ্রুত মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে ‘মুন অ্যালার্ট’ চালু হলেও শুরুতেই দেখা দিয়েছে বড় সমন্বয় সংকট। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও মুন অ্যালার্টের উদ্যোক্তাদের মধ্যে এখন কার্যকর কোনো সমন্বয় নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত তার ছবি ও পরিচয় হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সেই তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্ধার তৎপরতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

অথচ শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বা ‘গোল্ডেন টাইম’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়ের মধ্যে শিশুর ছবি, পরিচয় ও সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারলে উদ্ধারের সম্ভাবনাও বাড়ে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কতা ব্যবস্থা আর রাষ্ট্রীয় উদ্ধার ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

মুন অ্যালার্টে প্রযুক্তিনেই সমন্বিত উদ্ধার ব্যবস্থানিখোঁজ বা অপহৃত শিশুর তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ‘মুন অ্যালার্ট’— ‘মিসিং আর্জেন্ট অ্যালার্ট’ চালু করা হয়েছিল। অ্যাম্বার অ্যালার্ট মডেলে তৈরি এই ব্যবস্থা মূলত একটি শিশুর নিখোঁজের খবর দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ।

কোনো শিশু নিখোঁজ হলে তার ছবি, পরিচয় ও সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মেটার সহযোগিতায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে চালু হওয়া এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার প্রায় ১৬০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এই সতর্কবার্তা পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে দ্রুত অভিযান চালানোর জন্য যে রাষ্ট্রীয় সমন্বয় প্রয়োজন, সেখানেই তৈরি হয়েছে জটিলতা।

জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদাত রহমান বলছেন, শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য থানা থেকে নিয়ে তারা কাজ শুরু করেন। মেটার সহযোগিতায় ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে মুন অ্যালার্ট চালু করা হয়েছে। সিআইডির সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ শুরু হলেও বর্তমানে তাদের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।

তার ভাষায়, তারা নিখোঁজ শিশুর তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন; কিন্তু উদ্ধার করতে পারেন না। উদ্ধার ও তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তাই নিখোঁজ শিশুদের জন্য বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের পাশাপাশি জাতীয় ডেটাবেজ, বিশেষ বাজেট ও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সিআইডির বক্তব্যপ্রশাসনিক  নীতিগত জটিলতা: মুন অ্যালার্টের সঙ্গে সমন্বয় না থাকার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুন অ্যালার্ট আগে সিআইডির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত ছিল। বর্তমানে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে।

তার ভাষ্য, প্রশাসনিক পরিবর্তন ও নীতিগত জটিলতার কারণে যৌথ উদ্যোগটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়। মুন অ্যালার্টের কার্যক্রম ও সরকারি কার্যপদ্ধতির মধ্যে কিছু সমন্বয়গত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি হয়েছে দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠানোর প্রযুক্তি, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সংস্থার সঙ্গে সেই প্রযুক্তিকে নিয়মিত ও কার্যকরভাবে যুক্ত করার প্রক্রিয়াই এখন আটকে আছে।

২৪ ঘণ্টা অপেক্ষার অভিযোগ: নিখোঁজ শিশুদের স্বজনদের অভিযোগ, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় গেলে অনেক সময় সঙ্গে সঙ্গে জিডি নেওয়া হয় না। তাদের প্রথমে আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন কিংবা শিশুর বন্ধুদের কাছে খোঁজ নিতে বলা হয়। এরপরও না পাওয়া গেলে জিডি করতে বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পর অভিযোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়।

মুন অ্যালার্ট সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধারণাটিই বদলানো জরুরি। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, প্রচার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা শুরু হওয়া দরকার। কারণ সময় যত যায়, শিশুকে খুঁজে বের করার কাজ তত কঠিন হয়ে পড়ে।

শুধু সতর্কবার্তা নয়দরকার উদ্ধার অভিযান: সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করছেন, শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, যোগাযোগের নম্বর প্রকাশ এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজনদের নজরদারিতে আনা জরুরি।

তার মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে বেসরকারি উদ্যোগের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করলে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার এবং অপরাধ দমন আরও কার্যকর হবে।

উদ্ধার হওয়াদের মধ্যেও আছে মৃত্যুর ঘটনা: নিখোঁজ শিশুর পরিণতি সবসময় নিরাপদে ফিরে আসা নয়। গত ৯ জুলাই ময়মনসিংহের তারাকান্দা থেকে নিখোঁজ হয় দুই বছরের শিশু আব্দুল্লাহ। বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেও না পেয়ে থানায় জিডি করেছিল পরিবার। দুদিন পর উদ্ধার হয় শিশুটির মরদেহ।

অপরাধ বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নিখোঁজ শিশুদের কেউ কেউ পাচারচক্রের হাতে পড়তে পারে, দেশের বাইরে পাচার হতে পারে কিংবা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত ও উদ্ধার অভিযানও জরুরি।

সমন্বয় না থাকলে প্রযুক্তি কতটা কাজে আসবে?: মুন অ্যালার্টের সবচেয়ে বড় শক্তি— তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি— তদন্ত ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা। একটি শিশুকে দ্রুত খুঁজে পেতে এ দুই ব্যবস্থার একসঙ্গে কাজ করার কথা; কিন্তু সেই সমন্বয়ই যদি না থাকে, তাহলে প্রযুক্তির মাধ্যমে হাজারো মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

এখনো নিখোঁজ  হাজার শিশু: এরই মধ্যে প্রতিদিন নিখোঁজ হচ্ছে অসংখ্য শিশু। তিন বছরের আব্দুল মাহিন গত ২ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার নাঙ্গলকোট এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের সময় তার পরনে ছিল মিষ্টি রঙের গেঞ্জি ও হাফ প্যান্ট। দুদিন পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান মেলেনি।

গত ২৮ আগস্ট পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে নিখোঁজ হয় ১২ বছরের আবির হোসেন রিফাত। গাঢ় কালো টি-শার্ট ও ফুল প্যান্ট পরা রিফাতের খোঁজও প্রায় এক সপ্তাহে পাওয়া যায়নি। এর আগে ১৮ আগস্ট ঢাকার হাজারীবাগ এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় আট বছরের শিশু ইলমা। প্রায় ১৫ দিন পার হলেও তার সন্ধান পায়নি পরিবার।

মাহিন, রিফাত কিংবা ইলমা— এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো সন্ধান নেই ২ হাজার ৩৮ শিশুর।

মাহিনের পরিবার অপেক্ষা করছে। রিফাতের পরিবার অপেক্ষা করছে। ইলমার পরিবারও অপেক্ষায়।

আর তাদের মতো আরও দুই হাজারের বেশি পরিবার এখনো সন্তান ফিরে পাওয়ার আশায় দিন গুনছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বেসরকারিভাবে নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে সাড়া নেই পুলিশের

আপডেট সময় : ১২:১৯:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটি মিনিটই পরিবারের কাছে অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠার। নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে দ্রুত মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে ‘মুন অ্যালার্ট’ চালু হলেও শুরুতেই দেখা দিয়েছে বড় সমন্বয় সংকট। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও মুন অ্যালার্টের উদ্যোক্তাদের মধ্যে এখন কার্যকর কোনো সমন্বয় নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত তার ছবি ও পরিচয় হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সেই তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্ধার তৎপরতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

অথচ শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বা ‘গোল্ডেন টাইম’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়ের মধ্যে শিশুর ছবি, পরিচয় ও সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারলে উদ্ধারের সম্ভাবনাও বাড়ে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কতা ব্যবস্থা আর রাষ্ট্রীয় উদ্ধার ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

মুন অ্যালার্টে প্রযুক্তিনেই সমন্বিত উদ্ধার ব্যবস্থানিখোঁজ বা অপহৃত শিশুর তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ‘মুন অ্যালার্ট’— ‘মিসিং আর্জেন্ট অ্যালার্ট’ চালু করা হয়েছিল। অ্যাম্বার অ্যালার্ট মডেলে তৈরি এই ব্যবস্থা মূলত একটি শিশুর নিখোঁজের খবর দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ।

কোনো শিশু নিখোঁজ হলে তার ছবি, পরিচয় ও সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মেটার সহযোগিতায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে চালু হওয়া এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার প্রায় ১৬০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এই সতর্কবার্তা পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে দ্রুত অভিযান চালানোর জন্য যে রাষ্ট্রীয় সমন্বয় প্রয়োজন, সেখানেই তৈরি হয়েছে জটিলতা।

জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদাত রহমান বলছেন, শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য থানা থেকে নিয়ে তারা কাজ শুরু করেন। মেটার সহযোগিতায় ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে মুন অ্যালার্ট চালু করা হয়েছে। সিআইডির সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ শুরু হলেও বর্তমানে তাদের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।

তার ভাষায়, তারা নিখোঁজ শিশুর তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন; কিন্তু উদ্ধার করতে পারেন না। উদ্ধার ও তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তাই নিখোঁজ শিশুদের জন্য বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের পাশাপাশি জাতীয় ডেটাবেজ, বিশেষ বাজেট ও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সিআইডির বক্তব্যপ্রশাসনিক  নীতিগত জটিলতা: মুন অ্যালার্টের সঙ্গে সমন্বয় না থাকার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুন অ্যালার্ট আগে সিআইডির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত ছিল। বর্তমানে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে।

তার ভাষ্য, প্রশাসনিক পরিবর্তন ও নীতিগত জটিলতার কারণে যৌথ উদ্যোগটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়। মুন অ্যালার্টের কার্যক্রম ও সরকারি কার্যপদ্ধতির মধ্যে কিছু সমন্বয়গত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি হয়েছে দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠানোর প্রযুক্তি, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সংস্থার সঙ্গে সেই প্রযুক্তিকে নিয়মিত ও কার্যকরভাবে যুক্ত করার প্রক্রিয়াই এখন আটকে আছে।

২৪ ঘণ্টা অপেক্ষার অভিযোগ: নিখোঁজ শিশুদের স্বজনদের অভিযোগ, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় গেলে অনেক সময় সঙ্গে সঙ্গে জিডি নেওয়া হয় না। তাদের প্রথমে আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন কিংবা শিশুর বন্ধুদের কাছে খোঁজ নিতে বলা হয়। এরপরও না পাওয়া গেলে জিডি করতে বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পর অভিযোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়।

মুন অ্যালার্ট সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধারণাটিই বদলানো জরুরি। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, প্রচার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা শুরু হওয়া দরকার। কারণ সময় যত যায়, শিশুকে খুঁজে বের করার কাজ তত কঠিন হয়ে পড়ে।

শুধু সতর্কবার্তা নয়দরকার উদ্ধার অভিযান: সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করছেন, শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, যোগাযোগের নম্বর প্রকাশ এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজনদের নজরদারিতে আনা জরুরি।

তার মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে বেসরকারি উদ্যোগের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করলে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার এবং অপরাধ দমন আরও কার্যকর হবে।

উদ্ধার হওয়াদের মধ্যেও আছে মৃত্যুর ঘটনা: নিখোঁজ শিশুর পরিণতি সবসময় নিরাপদে ফিরে আসা নয়। গত ৯ জুলাই ময়মনসিংহের তারাকান্দা থেকে নিখোঁজ হয় দুই বছরের শিশু আব্দুল্লাহ। বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেও না পেয়ে থানায় জিডি করেছিল পরিবার। দুদিন পর উদ্ধার হয় শিশুটির মরদেহ।

অপরাধ বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নিখোঁজ শিশুদের কেউ কেউ পাচারচক্রের হাতে পড়তে পারে, দেশের বাইরে পাচার হতে পারে কিংবা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত ও উদ্ধার অভিযানও জরুরি।

সমন্বয় না থাকলে প্রযুক্তি কতটা কাজে আসবে?: মুন অ্যালার্টের সবচেয়ে বড় শক্তি— তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি— তদন্ত ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা। একটি শিশুকে দ্রুত খুঁজে পেতে এ দুই ব্যবস্থার একসঙ্গে কাজ করার কথা; কিন্তু সেই সমন্বয়ই যদি না থাকে, তাহলে প্রযুক্তির মাধ্যমে হাজারো মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

এখনো নিখোঁজ  হাজার শিশু: এরই মধ্যে প্রতিদিন নিখোঁজ হচ্ছে অসংখ্য শিশু। তিন বছরের আব্দুল মাহিন গত ২ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার নাঙ্গলকোট এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের সময় তার পরনে ছিল মিষ্টি রঙের গেঞ্জি ও হাফ প্যান্ট। দুদিন পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান মেলেনি।

গত ২৮ আগস্ট পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে নিখোঁজ হয় ১২ বছরের আবির হোসেন রিফাত। গাঢ় কালো টি-শার্ট ও ফুল প্যান্ট পরা রিফাতের খোঁজও প্রায় এক সপ্তাহে পাওয়া যায়নি। এর আগে ১৮ আগস্ট ঢাকার হাজারীবাগ এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় আট বছরের শিশু ইলমা। প্রায় ১৫ দিন পার হলেও তার সন্ধান পায়নি পরিবার।

মাহিন, রিফাত কিংবা ইলমা— এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো সন্ধান নেই ২ হাজার ৩৮ শিশুর।

মাহিনের পরিবার অপেক্ষা করছে। রিফাতের পরিবার অপেক্ষা করছে। ইলমার পরিবারও অপেক্ষায়।

আর তাদের মতো আরও দুই হাজারের বেশি পরিবার এখনো সন্তান ফিরে পাওয়ার আশায় দিন গুনছে।