নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ব নদী দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষায় শনিবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বসিলা লঞ্চ ঘাট থেকে লঞ্চ যোগে ‘বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দখল-দূষণ এর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বেলা, এএলআরডি, নাগরিক উদ্যোগ, বারসিক, বাদাবন সংঘ, ক্যাপস, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, অনুসন্ধানী ক্রিডস, সিডিপি, ইকিউএমএস, গ্রীন ভয়েস, আরডিআরসি, সিডাব্লিউএফ, শিসউক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর কোস্টাল এন্ড মেরিন স্ট্যাডিজ, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফেন্ডস এলায়েন্স (ডুফা), নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোন, লিডার্স, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন, কোস্ট ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ঘুড়ি ফাউন্ডেশন এবং শীতলক্ষ্যা বাঁচাও আন্দোলনসহ দেশের পরিবেশ ও নদী প্রেমী ২৩টি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এ আয়োজনে বাপা’র সহসভাপতি জনাব মহিদুল হক খান এর সভাপতিত্বে নদী পরিদর্শন কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি ছিলেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন এমপি।
আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা’র কোষাধ্যক্ষ মো. আমিনূর রসুল, সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক, শাহজাহান মৃধা বেনু, হুমায়ুন কবির সুমন, ড. হালিমদাদ খান,, নির্বাহী সদস্য জনাব ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, স্থায়ী সদস্য শোভন কমল,বিআইডাব্লিউটিএর পরিচালক, মো. আলমগীর কবির, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট এর পরিচালক গাউস পিয়ারী, সিডাব্লিউএফ এর চেয়ারম্যান শাহ্ ইশরাত আজমেরী, এএলআরডি এর সানজিদা খাতুন রিপা, বারসিক এর জাহাঙ্গীর হোসেনসহ আয়োজক সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, এবং গ্রীন ভয়েস এর বিভিন্ন শাখার যুব প্রতিনিধিবৃন্দ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন এমপি বলেন, বাংলাদেশের প্রাণ হচ্ছে নদী। এই নদী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সকল ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতির সঙ্গে এবং প্রতিটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই নদী আজ হুমকির মুখে। যারা এই নদীকে গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা করছে, আমি মনে করি প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা উচিত। নদী দখলদার ও দূষনকারীদের তালিকা প্রকাশ ও তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির প্রদানের দাবী করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে যেভাবে ব্যবস্থা নিই, মাদকের বিরুদ্ধে যেভাবে অভিযান পরিচালনা করি এবং অপরাধীদের নাম যেভাবে থানায় লিপিবদ্ধ থাকে, আমি মনে করি পরিবেশ, নদী-খালের ক্ষতি করে যারা, তাদেরও এভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত। যারা খাল ভরাট করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, নিজেদের স্বার্থের জন্য পরিবেশকে গলা টিপে হত্যা করে, পরিবেশের প্রত্যেকটি সেক্টরে যারা ক্ষতি করে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
এই সরকার চায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাণ এই নদীকে রক্ষা করতে। কৃষিখাতে, দেশের বিভিন্ন কাজে যেন আমরা নদী-নালা, খাল-বিলের পানি ব্যবহার করতে পারি, সেই চেষ্টা এই সরকার করে যাবে এবং সেই কর্মসূচিগুলো হাতে নিয়েছে। এই সরকারের পরিবেশ রক্ষার যতগুলো সেক্টর আছে, এই সেক্টরের দায়িত্বগুলো যোগ্য ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোকদের পদায়ন করে তাদের মাধ্যমে ভালো কাজ করা হবে।
সভাপতির বক্তেব্যে মহিদুল হক খান বলেন, বাপা দেশের নদনদী রক্ষায় দুই দশকের বেশীসময় ধরে নিরলসভাবে কাজ করে জাচ্ছে। দেশের সকল নদী আজ দখল দূষণে জর্জরিত। আমরা চাই দ্রুত সকল দখলদারদের তালিকা করে দোষিদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
বিআইডাব্লিউটিএর পরিচালক, আলমগীর কবির বলেন, আমরা শুরুতেই নদী রক্ষার কথা বলে আসছি। কোন কোন জায়গায় আমাদের নদীগুলোকে রক্ষা করতে হবে, কী কী হুমকি আমাদের আছে, সেই বিষয়গুলো আমাদের অনেকটাই আমরা জানি। কিন্তু তারপরেও অনেক বিষয় আছে যেগুলো আমরা জানি না। এজন্য আমার মনে হয় আজকে যারা এই পরিবেশবাদী সংগঠন আছেন, তাদের আন্দোলন এবং পত্রিকা, পত্রপত্রিকা এবং সাংবাদিক ভাইদের কঠোর পরিশ্রম এবং তাদের লেখালেখি এই কারণেই মূলত একটা সময় ১৯৯৯ সালে প্রথম এই নদীর উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করি। সেক্ষেত্রে আপনাদের সবার ভূমিকা ছিল। কারণ সরকার এমন অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল যে সরকারের পক্ষে আর তেমন কোনো করণীয় ছিল না, শক্তি ছিল না এটাকে উদ্ধার করার। আপনাদের আন্দোলনে পরবর্তীতে মহামান্য হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করে। এই হাইকোর্টের হস্তক্ষেপই ছিল নদী উদ্ধারের একমাত্র রক্ষাকবচ। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমান সরকারে যারা আছে তাদের যে আগ্রহ আমরা লক্ষ্য করছি, আমরা আশা করি এই সরকারের এই পাঁচ বছরের মধ্যে ইনশাল্লাহ আমরা একেবারেই এই ঢাকার চারপাশের নদী শুধু না, শহরের মধ্য থেকে প্রবাহমান সব নদীগুলোকেই আমরা একটা পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারব।
বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, গত অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে ১৪১৫ টি নদীর তালিকা করা হয়েছে। আমরা জানি আরও নদী ছিল, সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা বলি বাংলাদেশের নদীগুলো আমাদের প্রাণ। এই নদী রক্ষা করার জন্য, তিস্তা, বুড়িগঙ্গাসহ এই ঢাকা শহরের চারপাশের নদীগুলোকে রক্ষা করার জন্য ২০০৯ সালে যখন হাইকোর্টে রিট করে নদীর সীমানা নির্ধারণ করার কথা বলা হয়, এরপর নদীর সীমানা পিলারগুলো জিগজ্যাগ ভাবে বসানো হয়ে। এই পদ্ধতির ভিতর দিয়ে দখলদারদের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। যেখানে দখল হয়েছে, সেই দখলদারদের জায়গা নিরাপদ রেখে পিলারগুলো বসানো হয়েছে। তিনি নদীর একক অবিভাবক ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন স্বাধীন কার্যকরি প্রতিষ্ঠান করার দাবি করেন। নদী পরিদর্শন শেষে পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের নদ-নদী ভালো নেই। নদীর কান্না আজ দুচোখে দেখলাম। নদী দখলকারী, নদীর বুকে শাহ সিমেন্ট, স্ক্যান সিমেন্ট, সহ বেশকিছু কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। সরাসরি নদীর বুকে তাদের মালামাল পরিবহনের জন্য জেটি নির্মাণ করা হয়েছে প্রশাশনের নাকের ডগায়। কিন্তু প্রশাশন নির্বিকার।এসমস্ত দখলদারদের উচ্ছেদ করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরন সহ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য দাবী জানান তিনি।
বাপার সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাস বলেন, নদীগুলোকে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ের মাধ্যমেই রক্ষা করতে হবে। কারণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যে আমরা সমন্বয়ের অভাবগুলো দেখছি, সেই জায়গাগুলোকে আমাদের সমন্বয় করতে হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয়গুলো যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তবেই আমাদের নদীগুলো রক্ষা হবে।
সিডাব্লিউএফ এর চেয়ারম্যান শাহ ইশরাতে আজমেরী বলেন, আমাদের নদীগুলো দূষণমুক্ত করতে হবে। জীববৈচিত্র রক্ষা করার জন্য আমাদেরকে সচেতন হতে হবে এবং এর পাশাপাশি যারা দখল করছে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং সকল জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের এই নদী নিয়ে কাজ করতে হবে বলে জানান তিনি।
কর্মসূচিতে ১০ দফা দাবি জানানো হয়। দাবী গুলো হচ্ছে ১. বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর পুণরায় সীমানা জরিপ করে নদীভূমি দ্রুত দখলমুক্ত করতে হবে।২. নদীতে সরাসরি শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য ফেলার সব অবৈধ সংযোগ বন্ধ করতে হবে।৩. সব শিল্পকারখানার ETP সার্বক্ষণিক চালু রাখা এবং অনলাইন মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।৪. দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।৫. নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর মূল প্রবাহ ও জায়গা ফিরিয়ে দিতে হবে।৬. বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর পানি, তলানি ও জীববৈচিত্র্যের নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে হবে।৭. নদীতে প্লাস্টিক, পলিথিন, বাজারের বর্জ্য ও জাহাজের তেল-বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।৮. বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে নিয়ে সময়বদ্ধ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। ৯. রাষ্ট্র দেশের নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, হ্রদ, পুকুরসহ প্রাকৃতিক সম্পদের ট্রাস্টি বা অভিভাবকসুলভ রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। ১০. জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।


























