ঢাকা ০১:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ৬ বছর ধরে চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই

বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ৬ বছর ধরে চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই

বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে প্রায় ছয় বছর ধরে কোনো চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞের অনুমোদিত পদ আছে দুটি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দুটি পদই শূন্য। ফলে চোখের রোগীরা সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না।

এর ফলে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাচ্ছেন। কেউ কেউ জেলার বাইরেও যাচ্ছেন। চিকিৎসার খরচের সঙ্গে তাঁদের যাতায়াতসহ বাড়তি ব্যয়ও যোগ হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্নআয়ের মানুষ।

চোখের চিকিৎসায় বাইরে যেতে হচ্ছে রোগীদের

বাগেরহাটের নয়টি উপজেলা থেকে প্রতিদিন মানুষ এই হাসপাতালে আসেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বহির্বিভাগসহ বিভিন্ন সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগী আসেন। তাঁদের মধ্যে চোখের সমস্যা নিয়ে আসা রোগীও কম নয়।

কিন্তু বিশেষজ্ঞ না থাকায় পরীক্ষা, পরামর্শ ও চিকিৎসার জন্য রোগীদের অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ লাগলে তাঁরা বাগেরহাট শহরের বেসরকারি চক্ষু হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাচ্ছেন। অস্ত্রোপচার, উন্নত পরীক্ষা বা জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হলে অনেককে খুলনা বা গোপালগঞ্জে যেতে হচ্ছে।

কচুয়া থেকে আসা পারমিতা মিত্র বলেন, সরকারি হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকলে তিনি এখানেই চিকিৎসা নিতে পারতেন। এখন বাইরে যেতে হচ্ছে, তাই খরচও বাড়ছে।

এক রোগীর স্বজন সূর্য বলেন, জেলা হাসপাতালেই চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকা দরকার। তাহলে রোগীদের চোখের সমস্যা নিয়ে বাইরে ছুটতে হতো না।

রামপাল থেকে আসা আরেক রোগী কম খরচে চিকিৎসার আশায় সরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ না থাকায় তাঁকে বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে তাঁর সময় ও খরচ দুটিই বাড়ছে।

চক্ষু বিভাগ নয়, পুরো হাসপাতালেই চিকিৎসক সংকট

শুধু চক্ষু বিভাগে নয়, পুরো হাসপাতালেই চিকিৎসক ও জনবলের সংকট রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এখানে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৮৬টি। কর্মরত আছেন মাত্র ৩২ জন। অর্থাৎ ৫৪টি পদ শূন্য।

এদিকে রোগীর চাপও অনেক বেশি। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে বিভিন্ন সময়ে ৫০০ থেকে ৫৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে নির্ধারিত শয্যার প্রায় দ্বিগুণ রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে।

চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স ও অন্যান্য কর্মীরও ঘাটতি আছে। এতে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের চাপও বাড়ছে।

আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ, তবু জনবল ঘাটতি

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুন থেকে সরকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আউটসোর্সিং পদে জনবল নিয়োগ দিচ্ছে। এর আওতায় গ্যালন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে এখন ৬৬ জন আউটসোর্সিং কর্মী কাজ করছেন। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের প্রয়োজন মেটাতে আরও ২৮ জন কর্মী দরকার।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের মতে, বাড়তি জনবল নিয়োগ দিলে দৈনন্দিন সেবার চাপ কিছুটা কমবে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি না মিটলে চোখসহ বিশেষায়িত চিকিৎসায় রোগীদের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা কমবে না।

নতুন ভবন চালু হলেও নিয়োগ হয়নি পর্যাপ্ত জনবল

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন ভবনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়োগ হয়নি।

ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগীর চাপের সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, জনবল কম থাকায় চিকিৎসকদের বাড়তি চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে অনেক রোগীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার বাইরের হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ কী বলছে

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, চক্ষু বিশেষজ্ঞের দুটি অনুমোদিত পদই শূন্য। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।

জনবল সংকট নিয়ে তিনি বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে অনেক সময় ৫০০ থেকে ৫৫০ রোগী ভর্তি থাকেন। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি আছে। অনুমোদিত ৮৬টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩২ জন।

তিনি আরও বলেন, চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ শূন্য পদগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা হলে রোগীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।

বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ৬ বছর ধরে চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই

আপডেট সময় : ০১:০৬:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে প্রায় ছয় বছর ধরে কোনো চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞের অনুমোদিত পদ আছে দুটি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দুটি পদই শূন্য। ফলে চোখের রোগীরা সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না।

এর ফলে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাচ্ছেন। কেউ কেউ জেলার বাইরেও যাচ্ছেন। চিকিৎসার খরচের সঙ্গে তাঁদের যাতায়াতসহ বাড়তি ব্যয়ও যোগ হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্নআয়ের মানুষ।

চোখের চিকিৎসায় বাইরে যেতে হচ্ছে রোগীদের

বাগেরহাটের নয়টি উপজেলা থেকে প্রতিদিন মানুষ এই হাসপাতালে আসেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বহির্বিভাগসহ বিভিন্ন সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগী আসেন। তাঁদের মধ্যে চোখের সমস্যা নিয়ে আসা রোগীও কম নয়।

কিন্তু বিশেষজ্ঞ না থাকায় পরীক্ষা, পরামর্শ ও চিকিৎসার জন্য রোগীদের অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ লাগলে তাঁরা বাগেরহাট শহরের বেসরকারি চক্ষু হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাচ্ছেন। অস্ত্রোপচার, উন্নত পরীক্ষা বা জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হলে অনেককে খুলনা বা গোপালগঞ্জে যেতে হচ্ছে।

কচুয়া থেকে আসা পারমিতা মিত্র বলেন, সরকারি হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকলে তিনি এখানেই চিকিৎসা নিতে পারতেন। এখন বাইরে যেতে হচ্ছে, তাই খরচও বাড়ছে।

এক রোগীর স্বজন সূর্য বলেন, জেলা হাসপাতালেই চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকা দরকার। তাহলে রোগীদের চোখের সমস্যা নিয়ে বাইরে ছুটতে হতো না।

রামপাল থেকে আসা আরেক রোগী কম খরচে চিকিৎসার আশায় সরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ না থাকায় তাঁকে বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে তাঁর সময় ও খরচ দুটিই বাড়ছে।

চক্ষু বিভাগ নয়, পুরো হাসপাতালেই চিকিৎসক সংকট

শুধু চক্ষু বিভাগে নয়, পুরো হাসপাতালেই চিকিৎসক ও জনবলের সংকট রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এখানে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৮৬টি। কর্মরত আছেন মাত্র ৩২ জন। অর্থাৎ ৫৪টি পদ শূন্য।

এদিকে রোগীর চাপও অনেক বেশি। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে বিভিন্ন সময়ে ৫০০ থেকে ৫৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে নির্ধারিত শয্যার প্রায় দ্বিগুণ রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে।

চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স ও অন্যান্য কর্মীরও ঘাটতি আছে। এতে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের চাপও বাড়ছে।

আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ, তবু জনবল ঘাটতি

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুন থেকে সরকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আউটসোর্সিং পদে জনবল নিয়োগ দিচ্ছে। এর আওতায় গ্যালন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে এখন ৬৬ জন আউটসোর্সিং কর্মী কাজ করছেন। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের প্রয়োজন মেটাতে আরও ২৮ জন কর্মী দরকার।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের মতে, বাড়তি জনবল নিয়োগ দিলে দৈনন্দিন সেবার চাপ কিছুটা কমবে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি না মিটলে চোখসহ বিশেষায়িত চিকিৎসায় রোগীদের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা কমবে না।

নতুন ভবন চালু হলেও নিয়োগ হয়নি পর্যাপ্ত জনবল

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন ভবনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়োগ হয়নি।

ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগীর চাপের সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, জনবল কম থাকায় চিকিৎসকদের বাড়তি চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে অনেক রোগীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার বাইরের হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ কী বলছে

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, চক্ষু বিশেষজ্ঞের দুটি অনুমোদিত পদই শূন্য। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।

জনবল সংকট নিয়ে তিনি বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে অনেক সময় ৫০০ থেকে ৫৫০ রোগী ভর্তি থাকেন। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি আছে। অনুমোদিত ৮৬টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩২ জন।

তিনি আরও বলেন, চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ শূন্য পদগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা হলে রোগীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।