২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, কৃষ্ণসাগরে শস্য সরবরাহে সমস্যা এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের মতো সম্পদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট তীব্র হওয়ায় তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, খাদ্যপণ্য ও ধাতুর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়লে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, আগামী বছর পণ্যের দাম ৭ শতাংশ কমতে পারে। তবে ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে তীব্র এল নিনো আবহাওয়ার প্রভাবের আশঙ্কাসহ বিভিন্ন সংকট অব্যাহত থাকলে খাদ্যপণ্যের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি মুদ্রানীতি আরও কঠোর করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, সরবরাহে নতুন কোনো ধাক্কা এলে তা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলের মজুত কমে গেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মন্দা বাদ দিলে চার দশকের মধ্যে এটি হবে তেলের সরবরাহে সবচেয়ে বড় পতন।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, ‘পণ্যবাজার একই সময়ে বেশ কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বাণিজ্যে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
আয়হান কোসে বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের ভারে জর্জরিত নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করাই বিশ্বব্যাংকের অন্যতম অগ্রাধিকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে ইতোমধ্যে স্বল্প সুদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা হিসেবে ৮৭০ কোটি ডলার দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এসব দেশের মধ্যে ১০টি সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করেছে। আর ১৯টি দেশ নতুন অর্থায়ন নিয়েছে। কয়েকটি দেশ উভয় ধরনের সহায়তাই পেয়েছে।
জ্বালানি, খাদ্য ও ধাতুর দামেও বড় উল্লম্ফন
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় নিকট ভবিষ্যতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। চলতি বছরে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট তেলের গড় দাম ৯২ ডলার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
তেলের চাহিদা কমে যাওয়ার পূর্বাভাস না থাকলে দাম আরও বেশি হতে পারত। চলতি বছর বিশ্বে তেলের চাহিদা ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ সালের করোনা মহামারিজনিত সংকট এবং ১৯৮০ সালের তেলসংকটের পর এটি হবে চাহিদা কমে যাওয়ার তৃতীয় বৃহত্তম ঘটনা।
কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংঘাতের কারণে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের কিছু বেশি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে দাম আরও ৭ শতাংশের বেশি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম মোট প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রেকর্ড মাত্রার এল নিনো, কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে আরও বিঘ্ন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের বিস্তার এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকের মতো খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। ওই সময় খাদ্যসংকটের কারণে অতিরিক্ত ৪ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
চলতি বছর সারের দাম ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে। মূলত ইউরিয়ার দাম বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হবে। তবে ২০২৭ সালে সারের দাম আবার ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ২০২৬ সালে ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে এবং নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগের কারণে চাহিদা বাড়ায় অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
ভূরাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালে মূল্যবান ধাতুর দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে ২০২৭ সালে এ দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমতে পারে। সূত্র: রয়টার্স




















