ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র রাখতে চান অনেকেই। তবে চাইলেই কেনা বা বহন করা যায় না আগ্নেয়াস্ত্র। এ জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণের পাশাপাশি নিতে হয় সরকারি অনুমোদন। আবেদনকারীর বয়স, আয়কর পরিশোধ, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা এবং অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করেই দেওয়া হয় লাইসেন্স। রয়েছে পুলিশি তদন্ত ও প্রশাসনিক অনুমোদনের বাধ্যবাধকতাও।
লাইসেন্স পাওয়ার পরও ইচ্ছামতো অস্ত্র ব্যবহার করার সুযোগ নেই। অস্ত্র বহন, গুলি কেনা, ব্যবহার, সংরক্ষণ ও নবায়নের ক্ষেত্রে রয়েছে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ। নিয়ম ভাঙলে বাতিল হতে পারে লাইসেন্স।
ব্যক্তিগত লাইসেন্স পেতে কী যোগ্যতা লাগে
আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত পর্যায়ে লাইসেন্স পেতে আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। বয়স হতে হবে ৩০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। পাশাপাশি আবেদনকারীকে ব্যক্তি শ্রেণির আয়করদাতা হতে হবে।
প্রকাশিত নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী, পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেলের লাইসেন্সের ক্ষেত্রে আবেদনের আগের টানা তিন কর বছরে প্রতিবছর কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা এবং শটগানের ক্ষেত্রে প্রতিবছর কমপক্ষে ১ লাখ টাকা আয়কর পরিশোধের শর্ত রয়েছে। পরিশোধিত করের পরিমাণ উল্লেখ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রত্যয়নপত্রও আবেদনের সঙ্গে জমা দিতে হয়।
প্রবাসী বাংলাদেশি ও দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে বিশেষ শর্ত রয়েছে। তাদের আবেদনের যোগ্যতা প্রমাণে টানা তিন বছর প্রতিবছর কমপক্ষে ১২ লাখ টাকা রেমিট্যান্স পাঠানোর পাশাপাশি বিদেশে আয়কর দেওয়ার প্রমাণপত্র দিতে হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর তথ্য যাচাই করা হয়।
তবে এসব যোগ্যতা পূরণ করলেই লাইসেন্স নিশ্চিত নয়। আবেদনকারীর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা, অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা এবং অস্ত্র সংরক্ষণ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানও যাচাই করা হয়।
ফৌজদারি মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি হলে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া ফৌজদারি আদালতে চূড়ান্তভাবে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সাজা শেষ হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে লাইসেন্স পাবেন না বলে নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
সর্বোচ্চ কয়টি অস্ত্র রাখা যাবে
নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত পর্যায়ে একজন যোগ্য আবেদনকারীকে সর্বোচ্চ দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে একটি এনপিবি পিস্তল বা রিভলবার এবং অন্যটি শটগান বা এনপিবি রাইফেল হতে পারে।
তবে নিবন্ধিত শ্যুটারদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্যুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ তিনটি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আগে থেকেই দুটির বেশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান লাইসেন্স বহাল রাখার বিধানও রয়েছে। তবে বিক্রি, হস্তান্তর বা হারানোর কারণে কোনো অস্ত্রের মালিকানা থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তার পরিবর্তে নতুন লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ নেই বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
যেভাবে আবেদন করতে হয়
ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পেতে আবেদনকারীকে স্থায়ী ঠিকানার জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রশাসকের কাছে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। এরপর কয়েকটি ধাপে আবেদন যাচাই করা হয়।
প্রথমে পুলিশের মাধ্যমে আবেদনকারীর পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা হয়। পরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার নেন। এ সময় তার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা, অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা এবং অস্ত্র সংরক্ষণের বিষয়ে জ্ঞান বিবেচনা করা হয়।
শটগানের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই শেষে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যোগ্য মনে করলে লাইসেন্স ইস্যুর নির্দেশ দিতে পারেন। অন্যদিকে পিস্তল বা রিভলবারের ক্ষেত্রে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সুপারিশের পর আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি পাওয়া গেলে লাইসেন্স ইস্যু করা হয়।
লাইসেন্স পাওয়ার পর অস্ত্র কেনার তারিখ থেকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে অস্ত্রের তথ্য লিপিবদ্ধ করতে হয়। ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া অস্ত্রের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স লিপিবদ্ধ করার তারিখ থেকে সময় গণনার বিধান রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের নামে লাইসেন্সের শর্ত
সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি, অংশীদারি, লিমিটেড কোম্পানি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী নির্বাহী প্রধান বা মালিকের অনুকূলে লাইসেন্স ইস্যু করা হতে পারে।
আবেদনের সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন ও আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন জমা দিতে হয়। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে পরিচালকদের জীবনবৃত্তান্তও প্রয়োজন।
নীতিমালায় বেসরকারি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের শর্ত উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় সাধারণভাবে সর্বোচ্চ দুটি ১২ বোর শটগানের লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানের ধরন, নিরাপত্তাঝুঁকি, নগদ অর্থ লেনদেন, অবস্থান ও বার্ষিক আয় বিবেচনায় এ সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ সীমা ছয়টি অস্ত্রের বেশি নয়। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয়তা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে এ সীমা শিথিল করা যেতে পারে।
অস্ত্র ব্যবহার ও গুলি কেনার নিয়ম
লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারেও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, আত্মরক্ষা ও লক্ষ্যভেদের অনুশীলনের উদ্দেশ্যে গুলি ব্যবহার করা যায়। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে গুলি ব্যবহার করা হলে পরপরই সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হয়।
লক্ষ্যভেদের অনুশীলন করতে হলে সরকারের অনুমোদিত ফায়ারিং রেঞ্জ অথবা বাংলাদেশ শ্যুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের নির্ধারিত অনুশীলন কেন্দ্রে যেতে হয়। এ ক্ষেত্রে গুলি ব্যবহারের প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে রাখতে হয়।
প্রকাশিত নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী, লং ব্যারেল বা বন্দুক, শটগান ও রাইফেলের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১০০টি এবং শর্ট ব্যারেল বা পিস্তল ও রিভলবারের জন্য সর্বোচ্চ ৫০টি গুলি কেনার অনুমতি দেওয়া যায়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে ইস্যু করা প্রতিটি অস্ত্রের বিপরীতে বছরে সর্বোচ্চ ৫০টি গুলি কেনার বিধান রয়েছে।
ব্যবহৃত গুলির হিসাব ও প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়ে নতুন গুলি কেনার অনুমতি নিতে হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া কোনো ডিলার লাইসেন্সধারীর কাছে গুলি বিক্রি করতে পারেন না। নিবন্ধিত শ্যুটারদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্যুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের অনুমোদন প্রয়োজন।
লাইসেন্স নবায়ন ফি কত
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়নে অস্ত্রের ধরনভেদে আলাদা ফি নির্ধারিত রয়েছে। পিস্তল ও রিভলবারের ক্ষেত্রে প্রতিটির নবায়ন ফি ৩ হাজার টাকা। দোনলা ও একনলা বন্দুক, শটগান ও রাইফেলের ক্ষেত্রে প্রতিটির ফি ১ হাজার টাকা। অন্যান্য অস্ত্রের ক্ষেত্রে ফি ৪০০ টাকা।
এ ছাড়া পিস্তল, রিভলবার ও বন্দুকের ডিলিং এবং মেরামতি লাইসেন্সের প্রতিটির ফি ১ হাজার ৫০০ টাকা। রাইফেলের ডিলিং ও মেরামতি লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও একই ফি উল্লেখ করা হয়েছে। সেফ কিপিং লাইসেন্সের ফি ১ হাজার টাকা।
তবে আবেদন বা নবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে কার্যকর ফি ও সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
কখন লাইসেন্স বাতিল হতে পারে
অস্ত্রের লাইসেন্সের শর্ত যথাযথভাবে পালন না করলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লাইসেন্স বাতিল করতে পারে। অস্ত্র বিক্রি, হস্তান্তর বা স্বত্ব ত্যাগ করে জমা দিলে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে।
অস্ত্র নষ্ট হয়ে গেলে বা মেরামতের অযোগ্য হলে সেটি সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জমা দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল এবং অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
লাইসেন্স হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করে তার অনুলিপিসহ ইস্যুকারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যায়। পুরোনো লাইসেন্স বাতিল করে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নতুন অনুলিপি ইস্যু করা হয়।
ওয়ারিশসূত্রে অস্ত্র পেলে করণীয়
লাইসেন্সধারীর মৃত্যু হলে তার ওয়ারিশদের জন্যও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। প্রকাশিত নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর ১৫ দিনের মধ্যে ওয়ারিশরা অথবা আইনানুগ ওয়ারিশ না থাকলে সম্পত্তিতে অধিকারী নিকটাত্মীয়কে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিকটস্থ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হয়।
ওয়ারিশসূত্রে অস্ত্রের মালিকানা পরিবর্তন করতে হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। নতুন লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীকে আয়করসহ লাইসেন্স পাওয়ার অন্যান্য যোগ্যতাও পূরণ করতে হবে। যোগ্যতা না থাকলে যথাযথ অনুমোদন নিয়ে অস্ত্র বৈধ ডিলার বা বৈধ লাইসেন্সধারীর কাছে বিক্রি কিংবা সরকারি মালখানায় জমা দিতে হয়।























