নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী আগামীকাল রোববার (১ নভেম্বর) তিন মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পাওয়ার কথা সরকারি চাকরিজীবীদের। এ লক্ষ্যে বেতন পরিশোধের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। তবে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ না হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে বর্ধিত বেতন পাচ্ছেন না। তাদের আপাতত পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া সমন্বয় করে পরিশোধ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী ও ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের মধ্যে অনেকেরই নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড, বাড়িভাড়া ভাতা এবং পদোন্নতির পর আর্থিক সুবিধা হিসাব করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অসংগতি দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++ এর জটিলতা।
এসব সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে এখনো এসব আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমস্যার সমাধান ১ নভেম্বরের আগে করা সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন তৈরি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে এবং এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীরা ১২তম গ্রেডের কর্মচারীদের চেয়ে ৭০০ টাকা বেশি পাওয়ার কথা। কিন্তু নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের পর দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের বেতনকাঠামোয় প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ আগের কাঠামোয় মূল বেতন বেড়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতন ২৫ হাজার টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোয় ওই অঙ্কের বেতনধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ করা হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১১ হাজার ৩০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন ছিল ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। আগের কাঠামোয় তার মূল বেতন বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা। নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতন ২৪ হাজার ৩০০ টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। পরবর্তী বেতনধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।
ফলে প্রারম্ভিক বেতনে এগিয়ে থাকা ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর নতুন মূল বেতন হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা। বিপরীতে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী পাচ্ছেন ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ ১১তম গ্রেডের কর্মচারী ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ৭০০ টাকা কম মূল বেতন পাচ্ছেন।
কর্মচারীদের হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হলেও দুই গ্রেডের বেতনের এই ব্যবধান বজায় থাকছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। সে ক্ষেত্রে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৩৬০ টাকা বেশি পাবেন।
একইভাবে, ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। তখন ব্যবধান দাঁড়াবে ৫৮০ টাকা। আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের বেতন হবে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। তখন ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ৮০০ টাকা।
নতুন প্রজ্ঞাপনের ৫ ও ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেতন নির্ধারণ করে নতুন নির্ধারিত বেতন ও বর্তমান বেতনের পার্থক্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ৫০, ৭৫ ও ১০০ শতাংশ সুবিধা কার্যকরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্মচারীদের অভিযোগ, এই পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
নতুন বেতনকাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতা হিসাবের ক্ষেত্রেও অসংগতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কর্মচারীরা। তাদের দেওয়া একটি হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করার পর নবম গ্রেডে পদোন্নতি বা প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলে তার মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ মূল বেতন বাড়বে ১ হাজার ৩০০ টাকা।
তবে গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যাওয়ায় তার মোট আয় কমে যেতে পারে। দশম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হবে ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। অন্যদিকে, নবম গ্রেডে ৫১ হাজার টাকা মূল বেতনের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হবে ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। ফলে বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা।
এ হিসাবে মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা। ফলে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় ৬০০ টাকা কমে যেতে পারে।
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যাদের চাকরির বয়স আট বছর পূর্ণ হয়েছে এবং যাদের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা উভয়েই ১ জুলাই থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন। এতে একই গ্রেডের জ্যেষ্ঠ ও অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মকর্তার বেতন সমান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেতন নির্ধারণের ধাপের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নবীন কর্মকর্তার মূল বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়েও বেশি হতে পারে।
কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দুবার উচ্চতর গ্রেড পেতে অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মকর্তার ১৪ বছর লাগলেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে লাগতে পারে ১৬ বছর। তাদের মতে, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট না হলে এসব অসংগতি দূর করা কঠিন হবে।
বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++এর জটিলতার কথাও জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, এ কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। অভিজ্ঞ জনবলের ঘাটতি ও নতুন কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে।
আইবাস সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বিল তৈরি, অর্থ পরিশোধ এবং সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণে এই ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা নিরসন না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে সবার বর্ধিত বেতন দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলো সমাধানের পর বর্ধিত বেতন ও বকেয়া সমন্বয়ের কথা বলা হলেও কবে নাগাদ সব কর্মকর্তা-কর্মচারী তা পাবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি।
























