আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের ওপর সরাসরি অগ্রিম আয়কর আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে একেবারে খালি হাতে ফিরছে না সংস্থাটি। সরাসরি কর আদায়ের জনপ্রিয়তাবিরোধী পথে না হেঁটে, এবার ‘কৌশলী’ পথ বেছে নিয়েছে এনবিআর। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন (সিসি) মোটরসাইকেল এবং একাধিক অটোরিকশার মালিকদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে করের জালে বাঁধা হচ্ছে এই দুই খাতকে।
সরাসরি কর আরোপ না করলেও যাদের একাধিক অটোরিকশা আছে, নতুন বাজেটে তাদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। অর্থাৎ, এর মাধ্যমে অটোরিকশা ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনা হবে।

অন্যদিকে, সাধারণ মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর সরাসরি আয়কর আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ১৬৫ সিসির (ইঞ্জিন ক্ষমতা) ওপরের মোটরসাইকেল মালিকদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এখন থেকে এসব মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন কিংবা নবায়ন করতে হলে আয়কর রিটার্নের প্রাপ্তি স্বীকার (পিএসআর) দাখিল করতে হবে।
সাধারণ মোটরসাইকেল মালিকদের রেহাই মিললেও, ১৬৫ সিসির ওপরের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন ও নবায়ন করতে এখন থেকে আয়কর রিটার্নের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র (পিএসআর) দাখিল করতে হবে
এ বিষয়ে এনবিআরের আয়কর বিভাগের দায়িত্বশীল একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের খসড়ায় প্রথমে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশায় আয়কর আরোপের সুপারিশ ছিল। এরপর মোটরসাইকেল মালিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে করের হার কমানো হয়। সর্বশেষ দুই ধরণের যানবাহন থেকে সরাসরি কর আদায়ের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায় সহজ করতে সরাসরি আদায় না করে ভিন্ন কৌশলে কর সংগ্রহ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, মোটরসাইকেল কিংবা আটোরিকশা উভয় যানবাহন যেহেতু সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে থাকে। তাই এনবিআর বিলাসবহুল মোটরসাইকেল (যেমন-১৬৫ সিসি ওপরে ) মালিকদের আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হবে। কারণ এই ধরনের বাহন রাইড শেয়ারিংয়ে কম ব্যবহৃত হয় বা হয় না বললেই চলে। তাই রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নে রিটার্ন স্লিপ দেখাতে হবে। ফলে আয়কর দিতে বাধ্য হবেন তারা। অন্যদিকে অটোরিকশা শ্রমজীবী মানুষের বাহন হিসাবে আয়কর দিতে হবে না। তবে যারা একাধিক অটোরিকশা দিয়ে দিনের পর দিন ব্যবসা করে আসছে তাদের থেকে আয়কর আদায়ের চেষ্টা থাকবে আগামী বাজেটে। এক্ষেত্রে অটোরিকশা ব্যবসায়ীকে প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

এনবিআরের প্রস্তাবিত বাজেটের খসড়ার প্রথম দিকে ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল করমুক্ত রেখে ১১১ থেকে ১২৫ সিসি হলে দুই হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি হলে প্রতি বছর ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আদায়ের প্রস্তাব ছিল। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় শেষে কর কমিয়ে আমাদের নতুন প্রস্তাব তৈরি করা হয়। ওই প্রস্তাবে ১১০ সিসি থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত ৩ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি হলে বছর প্রতি ৫ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। এবার সেখানে থেকেও সরে আসলো এনবিআর।
শ্রমজীবী মানুষের বাহন হিসেবে সাধারণ অটোরিকশা চালকদের কর দিতে হবে না; তবে যাদের একাধিক অটোরিকশা রয়েছে এবং যারা এটি দিয়ে ব্যবসা করছেন, তাদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মোটরসাইকেল কিংবা অটোরিকশার চালকদের কোনো অগ্রিম আয়কর দিতে হয় না। তবে মোটরসাইকেল চালকদের এককালীন নিবন্ধন ফি ও ২ বছর পরপর রোড ট্যাক্স দিতে হয়। ৫০ থেকে ১২৫ সিসি মোটরসাইকেলের সর্বমোট রেজিস্ট্রেশন ফি ৯ হাজার ২৯১ টাকা। পরবর্তী ২ বছর পরপর প্রতি কিস্তি এক হাজার ১৫০ টাকা করে ৪টি কিস্তিতে অবশিষ্ট চার হাজার ৬০০ টাকা রোড ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। ১২৫ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন ফি ১১ হাজার ৭৬৪ টাকা। পরবর্তী ২ বছর পরপর প্রতি কিস্তি ২,৩০০ টাকা করে ৪টি কিস্তিতে অবশিষ্ট ৯ হাজার ২০০ টাকা রোড ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, গাড়ির মালিকদের প্রতিবছর ফিটনেস নবায়নের সময় নির্দিষ্ট হারে অগ্রিম আয়কর দিতে হয়, যা বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় মূল করের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮০। গড়ে প্রতিটি মোটরসাইকেল থেকে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে কর আদায় করা হলে সরকারের কোষাগারে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি কর আদায় করা যেতো। তবে বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর দুই হাজার ৫০০ টাকা, সিসিভেদে প্রাইভেট কার ও জিপে এই কর ২৫ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত, দোতলা বাস, এসি মিনিবাস ও কোস্টারের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা, ৫২ আসনের বেশি বাসে ২৫ হাজার টাকা এবং এর কম আসনের বাসে ২০ হাজার টাকা কর দিতে হয়। আর এসি বাসে ৫০ হাজার টাকা এবং নন-এসি মিনিবাস বা কোস্টারের ক্ষেত্রে ১২ হাজার ৫০০ টাকা অগ্রিম আয়কর রয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৭মে এনবিআরের সামনে কর আরোপের প্রতিবাদে মানববন্ধন করে স্বারকলিপি দিয়েছিল মটরসাইকেল চালকরা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার জন্য এনবিআর চেয়ারম্যানকে ওই স্মারকলিপি দেয়। যেখানে প্রস্তাবিত বাজেটে মোটরসাইকেলের ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের প্রস্তাব ছিল।
সারা দেশে চলাচল করা ৫০ লাখেরও বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে এবং শৃঙ্খলায় ফেরাতে শিগগিরই চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৫’
বাইকারদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে মোটরসাইকেল বর্তমানে কেবল শখের বাহন নয়; বরং এটি লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, কর্মসংস্থান ও জীবিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রাইড শেয়ারিং চালকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সময় সাশ্রয় ও যানজট এড়াতে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে অনেক নারীও ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলের মাধ্যমে নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে চলাচল করছেন। মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা ইতোমধ্যে রেজিস্ট্রেশন ফি, রোড ট্যাক্স, ফিটনেস, বিমা এবং জ্বালানির ওপর বিদ্যমান কর পরিশোধ করে আসছেন। এর পাশাপাশি নতুনভাবে অগ্রিম আয়কর আরোপ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
স্মারকলিপিতে বাইকারদের চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। যৌক্তিকভাবে পুনর্বিবেচনা করা। মোটরসাইকেলকে বিলাসী পণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে সাধারণ জনগণের প্রয়োজনীয় পরিবহন মাধ্যম হিসেবে মূল্যায়ন করা। বাইকারদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে পরিবহন খাতকে জনবান্ধব ও বাস্তবসম্মত রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নারী বাইকারদের নিরাপদ ও স্বাধীন চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মোটরসাইকেলের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।
দেশে নিবন্ধিত ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮০টি মোটরসাইকেল থেকে সরাসরি কর আদায় করা হলে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসতো। তবে জনস্বার্থে সেই পথে না হেঁটে বিলাসবহুল বাইক ও একাধিক অটোরিকশার মালিকদের পরোক্ষভাবে করজালে বাঁধার কৌশল নিয়েছে সরকার
অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় কোনো ধরনেরই কর দিতে হয় না। খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্যানুসারে, সারা দেশে ৫০ লাখেরও বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই চলাচল করছে ১০ থেকে ১২ লাখের মতো। এসব রিকশা নিবন্ধনের আওতায় আনতে গত বছর ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’র খসড়া করেছিল সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগ। যা শিগগিরই চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।
খসড়া ওই নীতিমালায় বলা হয়, গতি ও গাড়ির ধরনভেদে বিআরটিএ থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন নিতে হবে। কোনো ব্যক্তি নিজ নামে মধ্যম গতির তিনটির বেশি বা গঠিত পরিবহণ কোম্পানির নামে ২৫টির বেশি অটোরিকশা ক্রয় ও নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। ধীরগতির অটোরিকশার ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি কিনতে ও নিবন্ধন করতে পারবেন। অনুমোদিত ডিলার বা বিক্রেতা নিবন্ধনসংক্রান্ত যাবতীয় কাজ সম্পন্ন না করে মধ্যম ও ধীরগতির বৈদ্যুতিক-অটোরিকশা ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন না।
বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত হারে কর বা শুল্ক প্রযোজ্য হবে। এ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযান চলাচলের ক্ষেত্রে নিবন্ধন সনদ, হালনাগাদ ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আওতায় আনা হয়।


























