ঢাকা ০২:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাল নোট নিজের কাছে রাখলেও ৭ বছরের জেল: আসছে নতুন আইন

জাল নোট নিজের কাছে রাখলেও ৭ বছরের জেল: আসছে নতুন আইন

জাল নোট তৈরি, পরিবহন কিংবা বাজারজাতকরণের পাশাপাশি এখন থেকে জেনেশুনে নিজের কাছে জাল টাকা রাখলেও সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি রুখতে অর্থ মন্ত্রণালয় ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রণীত আট পৃষ্ঠার এই খসড়াটি বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বসাধারণের মতামত জানতে খসড়াটি বিভাগের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে।

কী আছে নতুন আইনে?

প্রস্তাবিত খসড়া আইনে জাল নোট তৈরি, তৈরির চেষ্টা করা, বিশেষ কাগজ, কালি বা নিরাপত্তা উপকরণ সংগ্রহ, জাল নোট আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, বিক্রি ও বাজারজাত করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর পাশাপাশি জেনেশুনে জাল নোট কাছে রাখা বা লেনদেন করার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল হতে পারে।

বর্তমানে দণ্ডবিধিসহ বিভিন্ন আইনে জাল মুদ্রা সংক্রান্ত বিচ্ছিন্ন কিছু বিধান রয়েছে। তবে সেগুলো আলাদা হওয়ায় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা তৈরি হয়। নতুন এই একক আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সব ধরনের অপরাধকে একই ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভেঙে দেওয়া হবে উৎপাদন ব্যবস্থা

খসড়া অনুযায়ী, জাল নোট তৈরিতে ব্যবহৃত কম্পিউটার, প্রিন্টিং মেশিন, বিশেষ কাগজ, কালি ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা যাবে এবং আদালতের নির্দেশে তা ধ্বংস করার বিধানও রাখা হয়েছে। এর ফলে শুধু জাল টাকা উদ্ধারই নয়, জাল নোট তৈরির মূল উৎপাদন ব্যবস্থাও ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে।

এই খসড়ার বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানান, সবার মতামত গ্রহণ শেষে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে এবং এরপর তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

অপরাধের নতুন সংজ্ঞা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ

প্রস্তাবিত আইনে প্রথমবারের মতো জাল মুদ্রার বিভিন্ন ধরন আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর ফলে সম্পূর্ণ নকল নোট তৈরির পাশাপাশি আসল নোট বিকৃত করে প্রতারণার ঘটনাও একই আইনের আওতায় আসবে।

এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত কারেন্সি অফিসারকে সন্দেহজনক নোট পরীক্ষা করে সেটি জাল কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়ন দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আদালতে এই প্রত্যয়নপত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

নতুন আইনের বেশিরভাগ অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে পুলিশ সরাসরি মামলা ও তদন্ত করতে পারবে এবং আসামিদের সহজে জামিন বা আপসের সুযোগ থাকবে না।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও আইন-শৃঙ্খলার তৎপরতা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে দেশে জাল নোট তৈরির কৌশলে বড় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক কম্পিউটার, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রঙিন প্রিন্টার ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাল নোট তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে ঈদসহ বিভিন্ন বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে জাল নোটের বিস্তার রোধে র‍্যাব, সিআইডি, ডিবি ও বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।

সম্প্রতি রাজধানীর টঙ্গী ও গুলিস্তানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩৪ লাখ টাকার জাল নোট উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যাংকগুলোতে নোট যাচাইয়ের যন্ত্র ব্যবহার, গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য দেখে লেনদেনের পরামর্শ দিচ্ছে। এমনকি চলতি বছর কোরবানির পশুর হাটেও জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বন্যা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর, ত্রাণ-চিকিৎসায় গুরুত্বারোপ

জাল নোট নিজের কাছে রাখলেও ৭ বছরের জেল: আসছে নতুন আইন

আপডেট সময় : ১০:৩৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

জাল নোট তৈরি, পরিবহন কিংবা বাজারজাতকরণের পাশাপাশি এখন থেকে জেনেশুনে নিজের কাছে জাল টাকা রাখলেও সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি রুখতে অর্থ মন্ত্রণালয় ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রণীত আট পৃষ্ঠার এই খসড়াটি বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বসাধারণের মতামত জানতে খসড়াটি বিভাগের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে।

কী আছে নতুন আইনে?

প্রস্তাবিত খসড়া আইনে জাল নোট তৈরি, তৈরির চেষ্টা করা, বিশেষ কাগজ, কালি বা নিরাপত্তা উপকরণ সংগ্রহ, জাল নোট আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, বিক্রি ও বাজারজাত করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর পাশাপাশি জেনেশুনে জাল নোট কাছে রাখা বা লেনদেন করার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল হতে পারে।

বর্তমানে দণ্ডবিধিসহ বিভিন্ন আইনে জাল মুদ্রা সংক্রান্ত বিচ্ছিন্ন কিছু বিধান রয়েছে। তবে সেগুলো আলাদা হওয়ায় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা তৈরি হয়। নতুন এই একক আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সব ধরনের অপরাধকে একই ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভেঙে দেওয়া হবে উৎপাদন ব্যবস্থা

খসড়া অনুযায়ী, জাল নোট তৈরিতে ব্যবহৃত কম্পিউটার, প্রিন্টিং মেশিন, বিশেষ কাগজ, কালি ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা যাবে এবং আদালতের নির্দেশে তা ধ্বংস করার বিধানও রাখা হয়েছে। এর ফলে শুধু জাল টাকা উদ্ধারই নয়, জাল নোট তৈরির মূল উৎপাদন ব্যবস্থাও ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে।

এই খসড়ার বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানান, সবার মতামত গ্রহণ শেষে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে এবং এরপর তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

অপরাধের নতুন সংজ্ঞা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ

প্রস্তাবিত আইনে প্রথমবারের মতো জাল মুদ্রার বিভিন্ন ধরন আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর ফলে সম্পূর্ণ নকল নোট তৈরির পাশাপাশি আসল নোট বিকৃত করে প্রতারণার ঘটনাও একই আইনের আওতায় আসবে।

এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত কারেন্সি অফিসারকে সন্দেহজনক নোট পরীক্ষা করে সেটি জাল কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়ন দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আদালতে এই প্রত্যয়নপত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

নতুন আইনের বেশিরভাগ অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে পুলিশ সরাসরি মামলা ও তদন্ত করতে পারবে এবং আসামিদের সহজে জামিন বা আপসের সুযোগ থাকবে না।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও আইন-শৃঙ্খলার তৎপরতা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে দেশে জাল নোট তৈরির কৌশলে বড় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক কম্পিউটার, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রঙিন প্রিন্টার ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাল নোট তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে ঈদসহ বিভিন্ন বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে জাল নোটের বিস্তার রোধে র‍্যাব, সিআইডি, ডিবি ও বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।

সম্প্রতি রাজধানীর টঙ্গী ও গুলিস্তানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩৪ লাখ টাকার জাল নোট উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যাংকগুলোতে নোট যাচাইয়ের যন্ত্র ব্যবহার, গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য দেখে লেনদেনের পরামর্শ দিচ্ছে। এমনকি চলতি বছর কোরবানির পশুর হাটেও জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।