২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক বিশাল যৌথ সামরিক অভিযানে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন, যা ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করে। এই হামলার পর ইরান সরকার ৮৬ বছর বয়সী এই আয়াতুল্লাহর “শাহাদাত”-এর প্রেক্ষিতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে, যিনি ৩৬ বছরের বেশি সময় ধরে ইরান শাসন করেছিলেন। তাঁর ৩৬ বছরের মেয়াদ তাঁকে সে সময় পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘতম-দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধানে পরিণত করেছিল।
এই একই হামলায় খামেনির পরিবারের আরও চারজন সদস্যও নিহত হন, যাঁদের মরদেহও পরবর্তী শবযাত্রায় বহন করা হয়েছিল। ইসরায়েল দাবি করে, সেদিনের হামলায় ইরানের সিংহভাগ শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন — যার মধ্যে ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আব্দোলরাহিম মুসাভি, বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর এবং প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব আলী শামখানি।
যেহেতু খামেনি কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত উত্তরসূরি ছাড়াই নিহত হন, তাই রবিবার একটি তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয় — যাতে ছিলেন মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের কট্টরপন্থী প্রধান গোলামহোসেন মোহসেনি এজেই এবং জ্যেষ্ঠ ধর্মগুরু আলিরেজা আরাফি।
তবে বিপ্লবী গার্ড দ্রুত একজন স্থায়ী নেতা নিয়োগের জন্য চাপ দিতে থাকে, এবং অবশেষে ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস আলী খামেনির পুত্র মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। উল্লেখযোগ্য যে, উত্তরাধিকারের আগে মোজতবা খামেনি সাধারণত “হোজ্জাতোলেস্লাম” পদমর্যাদার আলেম হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যা আয়াতুল্লাহর চেয়ে নিচের স্তর — সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতাকে একজন জ্যেষ্ঠ ইসলামি আইনজ্ঞ হতে হয় বলে, পর্যবেক্ষকরা মনে করেন তাঁর ধর্মীয় পদমর্যাদা বাড়ানো হয়েছিল উত্তরাধিকারের বৈধতা জোরদার করার জন্য।
মোজতবা খামেনি সেই হামলাতেই গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়, যে হামলায় তাঁর মা ও স্ত্রীও নিহত হন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি প্রকাশ্যে আসেননি, কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন কখনো নিজের মুখ দেখাননি বা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করেননি।
নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর, গত ৯ জুলাই আলী খামেনিকে তাঁর জন্মভূমি মাশহাদে ইরানের সবচেয়ে পবিত্র শিয়া মাজার ইমাম রেজা শ্রাইনে দাফন করা হয়। দাফন অনুষ্ঠানটি ব্যক্তিগত ছিল, কিন্তু তার আগে এক সপ্তাহব্যাপী প্রকাশ্য শোক ও শবযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে মোট দেড় কোটির বেশি মানুষ অংশ নেয় ইরানি হিসাব অনুযায়ী যা সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
তবে এই দাফন অনুষ্ঠানের কোনো ধাপেই মোজতবা খামেনি উপস্থিত ছিলেন না যুদ্ধ শুরুর সেই ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। এর একটি বড় কারণ নিরাপত্তা ঝুঁকি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সম্প্রতি বলেছেন, মোজতবা খামেনিও “হত্যার তালিকায়” রয়েছেন।
১১ জুলাইয়ের বিবৃতি
৯ জুলাই তারিখ দিয়ে স্বাক্ষরিত কিন্তু শনিবার (১১ জুলাই) প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, তাঁর বাবা ও সাম্প্রতিক দুই যুদ্ধে নিহত অন্যান্যদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে তিনি বা অন্য কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকুন বা না থাকুন, তা নির্বিশেষে।
তাঁর বার্তার মূল বক্তব্য ছিল:
“আমরা তোমার পবিত্র রক্ত এবং এই দুই যুদ্ধের সকল শহীদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করছি অপরাধী ও অসম্মানিত হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে। এই প্রতিশোধ আমাদের জাতির দাবি, এবং তা অবশ্যই সংঘটিত হবে।”
তিনি আরও বলেন, দায়ীরা “শান্তিপূর্ণ মৃত্যুর আশা কবরে নিয়ে যাবে,” এবং প্রতিশোধ তাঁর নিজের বা অন্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতির উপর নির্ভরশীল নয়। “আমরা থাকি বা না থাকি, এটি অর্জিত হবেই, এবং শীঘ্রই বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতাকামীদের মধ্যে কেউ না কেউ এই ঐশ্বরিক মিশনের একটি অংশ পালন করবে।”
অন্য এক লিখিত বার্তায় (শুক্রবার স্বাক্ষরিত) তিনি বলেন, “এই প্রতিশোধ আমাদের জাতির ইচ্ছা এবং তা অবশ্যই কার্যকর হতে হবে। এই বিষয়টি আমার ব্যক্তিগত অস্তিত্ব বা অন্য কর্মকর্তাদের অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে না। আমরা উপস্থিত থাকি বা না থাকি, এটি ঘটবেই।”
এই বার্তায় তিনি বাবার শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন — ইরান ও প্রতিবেশী ইরাকে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানকে তিনি “enemy-shattering” (শত্রু-বিধ্বংসী) বলে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষায়: “আমি ইরান ও ইরাকজুড়ে, বিশেষত তেহরান, কোম, নাজাফ, কারবালা ও মাশহাদে কোটি কোটি মানুষের অবিশ্বাস্য, শত্রু-বিধ্বংসী ও ঐতিহাসিক উপস্থিতির জন্য আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”
যে প্রেক্ষাপটে বিবৃতিটি এলো
এই বিবৃতি এসেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক হুমকির পর, যিনি তাঁর জীবননাশের নতুন এক ষড়যন্ত্রের প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ইরানকে “ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন” করার হুমকি দেন। ট্রাম্প বলেন, “১০০০ ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের দিকে তাক করা এবং প্রস্তুত রয়েছে, সঙ্গে হাজার হাজার আরও ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রয়েছে, যদি ইরান সরকার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘোষিত তাদের হুমকি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টকে অর্থাৎ আমাকে হত্যা বা হত্যাচেষ্টা করার চেষ্টা করে।”
দাফন অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলার পর পাল্টাপাল্টি হামলা চালাতে থাকে, যদিও দুই পক্ষ আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে একই সময়ে ট্রাম্প বলেছেন যুদ্ধবিরতি “শেষ হয়ে গেছে।


























