বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে বাংলাদেশে বিশাল অর্থনৈতিক ঝুঁকির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে দেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে দারিদ্র্য কমানোর পরিকল্পনাও চরম বাধার মুখে পড়ছে।
মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ঘরে এসে পৌঁছাচ্ছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে ও গ্যাসের সংকটে কারখানায় উৎপাদন থামছে। এছাড়া সার উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজারে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
অর্থনীতির বিদ্যমান চাপ ও দারিদ্র্যের প্রভাব
বাংলাদেশ এমন এক সময়ে এই সংকটে পড়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি এমনিতেই বেশ চাপে রয়েছে। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি এবং ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এছাড়া সরকারের হাতে খরচ করার মত পর্যাপ্ত অর্থ নেই।
পাশাপাশি গত কয়েক বছরে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় দারিদ্র্য বেড়েছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি যোগ হওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রবৃদ্ধির সুফল পাচ্ছে না। ফলে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে শুধু ২০২৫ সালেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১৪ লাখ বেড়েছে।
আশার আলো ফিকে হচ্ছে ২০২৬ সালে
২০২৬ সালের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক দেখাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত না হলে এ বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সংখ্যা কমে মাত্র ৫ লাখে নামতে পারে।
সংস্থার মতে, দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ। এর ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও কারখানার খরচ বেড়ে যাবে। তবে সংঘাত না থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
জ্যলানি ও গ্যাস সংকট
│
┌──────────────┼──────────────┐
▼ ▼ ▼
শিল্প উৎপাদন কৃষি ও সার স্বাস্থ্য খাত
ব্যাহত সংকট ব্যয় বৃদ্ধি
│ │ │
└──────────────┼──────────────┘
▼
৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি
জ্বালানি খাতের ওপর সরাসরি আঘাত
বাংলাদেশ প্রাথমিক জ্বালানি চাহিদার অর্ধেকের বেশি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে ২০১৬ সালের তুলনায় দেশে গ্যাসের উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে। তাই আমরা আমদানির ওপর চরমভাবে নির্ভর হয়ে পড়েছি।
বর্তমানে আমদানি করা তেলের ৬০-৬৫% এবং এলএনজির ৫৫-৬০% মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। তাই ওই অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলেই বাংলাদেশ সরাসরি ধাক্কা খায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় আমদানি খরচ অনেক বেড়েছে।
ভর্তুকির বাড়তি চাপ ও সরকারি অর্থায়ন
চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ অনেক বাড়তে পারে। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২.৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বাজেট কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাবেক সরকারের থেকে পাওয়া অর্থনৈতিক সমস্যা রাতারাতি ঠিক করা সম্ভব নয় বলে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতি সামলাতে সরকারকে সময় নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার চরম অনিশ্চয়তা
জ্বালানি সংকট সরাসরি দেশের কৃষি খাতে প্রভাব ফেলছে। ফলে সারসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এর কারণে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী বড় ঝুঁকিতে পড়ছে।
গ্যাস সংকটে দেশের ৬টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে ৫টি বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে বাজারে ইউরিয়ার দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে ক্ষুদ্র কৃষকেরা খাদ্যনিরাপত্তা ও আয়ের দিক থেকে ধাক্কা খাচ্ছেন।
স্বাস্থ্য খাত ও সার্বিক শিল্প উৎপাদনে মন্দা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে দেশের হাজার হাজার হাসপাতালের পরিচালনা খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যয় বাড়ায় ওষুধ শিল্প চাপের মুখে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সক্ষমতা দিন দিন কমছে।
শিল্পকারখানায় গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধ রয়েছে এবং কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তাই সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের এই আশঙ্কাজনক রিপোর্টই এখন দেশের নির্মম বাস্তবতা।

























