ঢাকা ০৩:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৫ ব্যাংকে ২.২৯ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড প্রভিশন ঘাটতি

১৫ ব্যাংকে ২.২৯ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড প্রভিশন ঘাটতি

অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংক খাত চরম সংকটে পড়েছে। আমানতের নিরাপত্তায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ফলে বিপুল পরিমাণ ঋণের বিপরীতে রেকর্ড প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দেশের ইতিহাসে ব্যাংক খাতে আগে কখনো এত বড় ঘাটতি দেখা যায়নি।

রাষ্ট্রায়ত্ত ৫ ব্যাংকে ৭৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি

খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক ঝুঁকি দিন দিন আরও বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি ৫টি ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। একক ব্যাংক হিসেবে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।

এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঘাটতি প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।

বেসরকারি ১০ ব্যাংকে ১.৫ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি

বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ঘাটতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে। ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এরপর ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

এছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৭১ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে মার্কেটাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি, কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি এবং এনআরবি ব্যাংকের ঘাটতি ১৩০ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল

জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

বর্তমানে মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। অর্থাৎ, ব্যাংকের দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার ঋণের প্রায় ৩৩ টাকা ৭৮ পয়সা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর বড় অংশই আর আদায়যোগ্য নয় বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদদের মতামত ও করণীয়

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণই মূল সমস্যা। খেলাপি ঋণ না থাকলে এই প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হতো না।

তিনি আরও জানান, খেলাপিদের ছাড় দেওয়া এবং ঘাটতি সত্ত্বেও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ ব্যাংক খাতে ভুল বার্তা দিচ্ছে। এর ফলে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে পড়ছে। এই সংকট কাটাতে ক্ষতিকর নীতিমালা বাতিল এবং ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রভিশন ঘাটতির প্রভাব

নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ ঋণের জন্য দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। তবে নিম্নমানের খেলাপিতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক খেলাপিতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ ঋণে ১০০ শতাংশ প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক।

প্রভিশন ঘাটতি থাকলে কোনো ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। একই সঙ্গে এই ঘাটতির কারণে ব্যাংক মূলধন সংকটে পড়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই খেলাপি ঋণ কমানো এবং অনিয়ম বন্ধ না করলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

১৫ ব্যাংকে ২.২৯ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড প্রভিশন ঘাটতি

আপডেট সময় : ০১:৪৫:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংক খাত চরম সংকটে পড়েছে। আমানতের নিরাপত্তায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ফলে বিপুল পরিমাণ ঋণের বিপরীতে রেকর্ড প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দেশের ইতিহাসে ব্যাংক খাতে আগে কখনো এত বড় ঘাটতি দেখা যায়নি।

রাষ্ট্রায়ত্ত ৫ ব্যাংকে ৭৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি

খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক ঝুঁকি দিন দিন আরও বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি ৫টি ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। একক ব্যাংক হিসেবে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।

এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঘাটতি প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।

বেসরকারি ১০ ব্যাংকে ১.৫ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি

বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ঘাটতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে। ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এরপর ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

এছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৭১ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে মার্কেটাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি, কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি এবং এনআরবি ব্যাংকের ঘাটতি ১৩০ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল

জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

বর্তমানে মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। অর্থাৎ, ব্যাংকের দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার ঋণের প্রায় ৩৩ টাকা ৭৮ পয়সা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর বড় অংশই আর আদায়যোগ্য নয় বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদদের মতামত ও করণীয়

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণই মূল সমস্যা। খেলাপি ঋণ না থাকলে এই প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হতো না।

তিনি আরও জানান, খেলাপিদের ছাড় দেওয়া এবং ঘাটতি সত্ত্বেও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ ব্যাংক খাতে ভুল বার্তা দিচ্ছে। এর ফলে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে পড়ছে। এই সংকট কাটাতে ক্ষতিকর নীতিমালা বাতিল এবং ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রভিশন ঘাটতির প্রভাব

নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ ঋণের জন্য দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। তবে নিম্নমানের খেলাপিতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক খেলাপিতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ ঋণে ১০০ শতাংশ প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক।

প্রভিশন ঘাটতি থাকলে কোনো ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। একই সঙ্গে এই ঘাটতির কারণে ব্যাংক মূলধন সংকটে পড়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই খেলাপি ঋণ কমানো এবং অনিয়ম বন্ধ না করলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে।