ঢাকা ০২:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল: বেশি ফি দিয়েও মালিকানা পাবে না বাংলাদেশ

তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল: বেশি ফি দিয়েও মালিকানা পাবে না বাংলাদেশ

দেশের তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি পুনঃগ্যাসীকরণ ফি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সরকারের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে টার্মিনালের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতার নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার মার্কিন ডলার ফি দাবি করেছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বিল্ড-ওন-অপারেট (বিওও) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এ পদ্ধতিতে টার্মিনালের মালিকানা চীনা প্রতিষ্ঠানটির কাছেই থাকবে। বিপরীতে আগের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোতে বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওওটি) পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। ওই ব্যবস্থায় চুক্তির মেয়াদ শেষে টার্মিনালের মালিকানা বিনামূল্যে পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তরের শর্ত ছিল।

বর্তমানে দেশে পরিচালিত এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিটের টার্মিনালে ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার পুনঃগ্যাসীকরণ ফি দেওয়া হচ্ছে। সেই হিসাবে চীনা প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত ফি এক্সিলারেটের তুলনায় প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সামিটের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

এমনকি ২০২৪ সালের মার্চে সামিটের বাতিল হওয়া দ্বিতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত দৈনিক ৩ লাখ ডলারের চেয়েও নতুন প্রস্তাবের ফি বেশি। ওই প্রকল্পটি বিওওটি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল।

এ ছাড়া রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দৈনিক ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলার ফি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছিল। চীনা কোম্পানির প্রস্তাবিত ফি সেই হারকেও উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে বাতিল হওয়া দ্বিতীয় এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি পুনর্বহালের অনুরোধ জানিয়েছে সামিট। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ১৫ বছর পর ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ), মুরিং ব্যবস্থা এবং সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মালিকানা বিনামূল্যে পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হতো।

পেট্রোবাংলাকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক চিঠিতে সামিট জানিয়েছে, দৈনিক ফির পার্থক্য বিবেচনায় তাদের প্রকল্পের মাধ্যমে ১৫ বছরে প্রায় ২৩ কোটি মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।

অন্যদিকে, চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনইই শুরুতে দৈনিক ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৪ ডলার ফি দাবি করেছিল। পরবর্তী সময়ে একাধিক দফা আলোচনার মাধ্যমে সেই প্রস্তাব কিছুটা কমানো হয়।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের দরকষাকষি কমিটি সরকারের কাছে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তিতে দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার অথবা ২০ বছর মেয়াদি চুক্তিতে দৈনিক ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার ফি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তির মোট আর্থিক দায় প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা হতে পারে।

চীনা প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জাহাজ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচ বেড়েছে। এ কারণেই বিওও পদ্ধতিতে তুলনামূলক বেশি ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে এ ধরনের বড় অঙ্কের চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও চীনা প্রতিষ্ঠানটির মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রকল্পের ব্যয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ মালিকানার বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশের জ্বালানি সরবরাহেও চাপ বেড়েছে। কাতার এনার্জি ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে আনায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এর ফলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে সরকারের ভর্তুকি বেড়ে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও ভর্তুকির বাড়তি চাপের মধ্যে নতুন টার্মিনালের উচ্চ পরিচালন ব্যয় দেশের জ্বালানি খাতে আরও আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল: বেশি ফি দিয়েও মালিকানা পাবে না বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ১২:০০:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

দেশের তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি পুনঃগ্যাসীকরণ ফি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সরকারের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে টার্মিনালের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতার নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার মার্কিন ডলার ফি দাবি করেছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বিল্ড-ওন-অপারেট (বিওও) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এ পদ্ধতিতে টার্মিনালের মালিকানা চীনা প্রতিষ্ঠানটির কাছেই থাকবে। বিপরীতে আগের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোতে বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওওটি) পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। ওই ব্যবস্থায় চুক্তির মেয়াদ শেষে টার্মিনালের মালিকানা বিনামূল্যে পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তরের শর্ত ছিল।

বর্তমানে দেশে পরিচালিত এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিটের টার্মিনালে ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার পুনঃগ্যাসীকরণ ফি দেওয়া হচ্ছে। সেই হিসাবে চীনা প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত ফি এক্সিলারেটের তুলনায় প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সামিটের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

এমনকি ২০২৪ সালের মার্চে সামিটের বাতিল হওয়া দ্বিতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত দৈনিক ৩ লাখ ডলারের চেয়েও নতুন প্রস্তাবের ফি বেশি। ওই প্রকল্পটি বিওওটি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল।

এ ছাড়া রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দৈনিক ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলার ফি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছিল। চীনা কোম্পানির প্রস্তাবিত ফি সেই হারকেও উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে বাতিল হওয়া দ্বিতীয় এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি পুনর্বহালের অনুরোধ জানিয়েছে সামিট। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ১৫ বছর পর ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ), মুরিং ব্যবস্থা এবং সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মালিকানা বিনামূল্যে পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হতো।

পেট্রোবাংলাকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক চিঠিতে সামিট জানিয়েছে, দৈনিক ফির পার্থক্য বিবেচনায় তাদের প্রকল্পের মাধ্যমে ১৫ বছরে প্রায় ২৩ কোটি মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।

অন্যদিকে, চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনইই শুরুতে দৈনিক ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৪ ডলার ফি দাবি করেছিল। পরবর্তী সময়ে একাধিক দফা আলোচনার মাধ্যমে সেই প্রস্তাব কিছুটা কমানো হয়।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের দরকষাকষি কমিটি সরকারের কাছে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তিতে দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার অথবা ২০ বছর মেয়াদি চুক্তিতে দৈনিক ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার ফি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তির মোট আর্থিক দায় প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা হতে পারে।

চীনা প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জাহাজ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচ বেড়েছে। এ কারণেই বিওও পদ্ধতিতে তুলনামূলক বেশি ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে এ ধরনের বড় অঙ্কের চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও চীনা প্রতিষ্ঠানটির মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রকল্পের ব্যয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ মালিকানার বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশের জ্বালানি সরবরাহেও চাপ বেড়েছে। কাতার এনার্জি ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে আনায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এর ফলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে সরকারের ভর্তুকি বেড়ে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও ভর্তুকির বাড়তি চাপের মধ্যে নতুন টার্মিনালের উচ্চ পরিচালন ব্যয় দেশের জ্বালানি খাতে আরও আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।