ঢাকা ১২:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমানের দেশে ফেরা: নেপথ্যে নিরাপত্তা শঙ্কা নাকি রাজনৈতিক কৌশল?

অসুস্থ মায়ের পাশে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও এখনই দেশে ফিরতে পারছেন না বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, দেশে ফেরার বিষয়টি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। গত শনিবার (২৯ নভেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এমন ইঙ্গিত দিলেও, এর পেছনে থাকা সুনির্দিষ্ট কারণগুলো ব্যাখ্যা করার সুযোগ সীমিত বলে উল্লেখ করেছেন।

তারেক রহমানের এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—আইনি বাধা না থাকলেও কেন তিনি দেশে ফিরছেন না? এর প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি জানিয়েছেন, তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা বা আপত্তি নেই।
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, যেহেতু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজেই এ বিষয়ে বার্তা দিয়েছেন, তাই এ নিয়ে আমার বা দলের আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

তবে দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে চায় না বিএনপি। তাঁদের মতে, আবেগ নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘খালেদা জিয়ার পর দলের একমাত্র ভরসাস্থল তারেক রহমান। তাঁর ফেরার পথে নানা অদৃশ্য বাধা থাকতে পারে, যা তিনি বিবেচনায় নিচ্ছেন।’ দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, দেশে বর্তমানে উগ্রবাদী তৎপরতা ও ‘মব জাস্টিস’-এর মতো ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেনি। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ নেতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা ঠিক হবে না।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ৫ আগস্টের পর থেকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা আইনি প্রক্রিয়ায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান দেশে ঘুরে গেছেন। দলের পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচনের আগে তাঁর ফেরার কথা বলা হলেও, সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো অজানা। এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে তারেক রহমানকে প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

গণমাধ্যমের তথ্যমতে, দলীয় প্রধান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতোমধ্যে দুটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি সংগ্রহ এবং অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে বিএনপি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বোঝাপড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমান মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করলেও, দলের ভবিষ্যৎ ও আঞ্চলিক রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা করেই তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

মূলত, ব্যক্তিগত ইচ্ছা, দলের কৌশল এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে তারেক রহমানের দেশে ফেরার চূড়ান্ত সময়।

তারেক রহমানের দেশে ফেরা: নেপথ্যে নিরাপত্তা শঙ্কা নাকি রাজনৈতিক কৌশল?

আপডেট সময় : ০৪:৫৬:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫

অসুস্থ মায়ের পাশে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও এখনই দেশে ফিরতে পারছেন না বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, দেশে ফেরার বিষয়টি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। গত শনিবার (২৯ নভেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এমন ইঙ্গিত দিলেও, এর পেছনে থাকা সুনির্দিষ্ট কারণগুলো ব্যাখ্যা করার সুযোগ সীমিত বলে উল্লেখ করেছেন।

তারেক রহমানের এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—আইনি বাধা না থাকলেও কেন তিনি দেশে ফিরছেন না? এর প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি জানিয়েছেন, তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা বা আপত্তি নেই।
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, যেহেতু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজেই এ বিষয়ে বার্তা দিয়েছেন, তাই এ নিয়ে আমার বা দলের আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

তবে দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে চায় না বিএনপি। তাঁদের মতে, আবেগ নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘খালেদা জিয়ার পর দলের একমাত্র ভরসাস্থল তারেক রহমান। তাঁর ফেরার পথে নানা অদৃশ্য বাধা থাকতে পারে, যা তিনি বিবেচনায় নিচ্ছেন।’ দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, দেশে বর্তমানে উগ্রবাদী তৎপরতা ও ‘মব জাস্টিস’-এর মতো ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেনি। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ নেতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা ঠিক হবে না।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ৫ আগস্টের পর থেকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা আইনি প্রক্রিয়ায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান দেশে ঘুরে গেছেন। দলের পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচনের আগে তাঁর ফেরার কথা বলা হলেও, সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো অজানা। এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে তারেক রহমানকে প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

গণমাধ্যমের তথ্যমতে, দলীয় প্রধান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতোমধ্যে দুটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি সংগ্রহ এবং অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে বিএনপি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বোঝাপড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমান মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করলেও, দলের ভবিষ্যৎ ও আঞ্চলিক রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা করেই তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

মূলত, ব্যক্তিগত ইচ্ছা, দলের কৌশল এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে তারেক রহমানের দেশে ফেরার চূড়ান্ত সময়।