১৯৩৮ সাল। ইউরোপের আকাশ তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা। আর দরজায় কড়া নাড়ছে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। রাজনীতির সেই চরম অস্থিরতা আর অশান্তির মাঝেই ফ্রান্সের মাটিতে বসেছিল ফুটবলের তৃতীয় মহাযজ্ঞ- ফিফা বিশ্বকাপ। কিন্তু মাঠের ফুটবলের চেয়ে বেশি জায়গা করে নিয়েছে রাজনৈতিক কূটনীতি, লাতিন আমেরিকার বয়কট, হিটলার-মুসোলিনির একনায়কতন্ত্রের দাপট এবং ইতালির টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের অবিশ্বাস্য কীর্তি। যুদ্ধের বিভীষিকা যখন বিশ্বকে গ্রাস করতে আসছিল, তখন এই আসরটি ছিল ফুটবলীয় সৌন্দর্যের শেষ প্রদীপ।
তৎকালীন ফিফার একটি অলিখিত নিয়ম ছিল- বিশ্বকাপের আসর পর্যায়ক্রমে একবার ইউরোপে এবং একবার দক্ষিণ আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে এবং ১৯৩৪ সালে ইতালিতে বিশ্বকাপ হওয়ার পর, ১৯৩৮ সালের আসরটি বসার কথা ছিল আর্জেন্টিনায়। কিন্তু ফিফা তাদের প্রতিশ্রুতি ভেঙে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপের দেশ ফ্রান্সকে স্বাগতিক হিসেবে নির্বাচন করে।
ফিফার এই সিদ্ধান্তে চরম ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো। ফলস্বরূপ, ফুটবল বিশ্বের তৎকালীন দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও প্রথম বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এই আসরটি পুরোপুরি বয়কট করে। লাতিন আমেরিকার একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সে এসেছিল কেবল ব্রাজিল।
বিশ্বকাপের মাঠ কাঁপানোর আগেই ইউরোপের রাজনীতিতে হিটলারের নাৎসি বাহিনী আগ্রাসন শুরু করে। বিশ্বকাপের মাত্র কয়েক মাস আগে জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করে নেয়। ফলে বাছাইপর্ব পাস করা সত্ত্বেও একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে টুর্নামেন্ট থেকে নাম প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় অস্ট্রিয়া।
শুধু তাই নয়, তাদের সেরা খেলোয়াড়দের জোর করে জার্মান দলে খেলানো হয়েছিল। তবে রাজনীতির জোর খাটিয়ে যে ফুটবল জেতা যায় না, তার প্রমাণ মেলে মাঠেই। অস্ট্রিয়ান তারকাদের নিয়েও প্রথম রাউন্ডেই সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নেয় হিটলারের জার্মানি।
১৯৩৮ বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল ব্রাজিল। কিংবদন্তি খেলোয়াড় লিওনিদাস ডা সিলভা, যাকে বলা হতো ‘দ্য ব্ল্যাক ডায়মন্ড’, তিনি তার জাদুকরী ফুটবল দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। পোল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তার সেই বিখ্যাত বাইসাইকেল কিক ও বুট খুলে খালি পায়ে গোল করার চেষ্টা আজও ফুটবল ইতিহাসের এক অমলিন গল্প। কিন্তু সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে লিওনিদাসকে বিশ্রামে রাখা ব্রাজিলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় এবং তারা ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকেই বিদায় নেয়।
সেবার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইতালি ও হাঙ্গেরি। ইতালির একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি এবারও দলকে তিন শব্দে (জিতো অথবা মরো) সেই বিখ্যাত টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। রোমাঞ্চকর ফাইনালে হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ফুটবল বিশ্বের প্রথম দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়ে ইতালি। দলের কোচ ভিত্তোরিও পোজোর অধীনে জিওসেপ্পে মেয়াজ্জা ও সিলভিও পিওলাদের ফুটবল শৈলী ছিল অনবদ্য।
১৯৩৮ সালের এই মহাযজ্ঞ শেষ হওয়ার পরপরই ইউরোপজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বেজে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিফা।
ফলে দীর্ঘ ১২ বছর ফুটবল বিশ্ব আর কোনো বিশ্বকাপ দেখেনি। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বকাপের আসল ট্রফি জুল রিমে কাপটি যেন নাৎসিরা চুরি করতে না পারে, সেজন্য ফিফার ইতালীয় ভাইস-প্রেসিডেন্ট ওত্তোরিনো বারাসি রোমের একটি ব্যাংকের লকার থেকে ট্রফিটি লুকিয়ে নিজের খাটের নিচে একটি জুতার বাক্সে রেখে দিয়েছিলেন।
অবশেষে ১৯৫০ সালে যখন ব্রাজিলের মাটিতে আবার বিশ্বকাপ ফেরে, ততদিনে ফুটবল বদলে গেছে, বদলে গেছে পৃথিবীও। কিন্তু ১৯৩৮ সালের সেই আসরটি আজও ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায় হয়ে টিকে আছে।






















