ঢাকা ১২:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্যাস–সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

গ্যাস–সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

দেশে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ১২টি নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানায় চিনি, গম, সয়াবিনবীজ ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাত হয়। ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গ্যাসের চাপ কমায় উৎপাদন বন্ধ

কয়েক দিন ধরেই গ্যাসের চাপ কমতে থাকায় এমজিআইয়ের কারখানাগুলোর উৎপাদন কমছিল। তবে গত বুধবার সংকট তীব্র আকার নেয়। এর ফলে একে একে বন্ধ হয়ে যায় সয়াবিন বীজ মাড়াই, তেল উৎপাদন, আটা-ময়দা তৈরিসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে প্রধান সাত পণ্য ও কাঁচামালের মোট আমদানির ২২ শতাংশই ছিল এমজিআইয়ের। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব হিসাবে, তাদের কারখানায় দৈনিক প্রায় ৯ হাজার টন এবং বছরে প্রায় ৩৩ লাখ টন পণ্য প্রক্রিয়াজাত হয়। তাই এতগুলো কারখানা একযোগে বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা বেড়েছে।

এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বৃহস্পতিবার জানান, বুধবার থেকে গ্যাসনির্ভর সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান, যাতে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়।

শুধু এমজিআই নয়, সংকটে আরও অনেক শিল্পগোষ্ঠী

এই গ্যাস সংকট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের অন্যান্য বড় নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পগোষ্ঠীর কারখানাও একই কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কোনোরকমে উৎপাদন সচল রেখেছে, তবে তা সক্ষমতার অনেক নিচে।

টি কে গ্রুপের ২৮টি কারখানার মধ্যে ২০টিই বর্তমানে বন্ধ। গত অর্থবছরে আলোচ্য পণ্য আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এই গ্রুপ প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছিল। গ্রুপটির পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার জানান, মাত্র চারটি কারখানায় সীমিত আকারে উৎপাদন চলছে, বাকিগুলো পুরোপুরি বন্ধ।

নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ শতাংশে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখা হলেও খরচ বেড়ে গেছে, অথচ উৎপাদন কমে গেছে।

এছাড়া স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের তিনটি বড় কারখানাই বন্ধ রয়েছে। সীকম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এগ্রোফুডের তিনটি কারখানাও মঙ্গলবার থেকে বন্ধ। সিটি গ্রুপের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলোও চালু করা যায়নি।

এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটিই মূল কারণ

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও স্বাভাবিক সময়েও তা পুরোপুরি মেটানো যায় না। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি গত ২১ জুলাই আগুন ও কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়।

গ্যাস–সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে কারখানা
গ্যাস–সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর গত ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়। তবে তা এখনো অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, বুধবার গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ২০৩ কোটি ঘনফুটে, ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট।

শুধু নিত্যপণ্য নয়, এই ঘাটতির প্রভাব পড়েছে ইস্পাত, কাচ ও বস্ত্র শিল্পেও।

বাজারে এখনই বড় প্রভাব না পড়লেও শঙ্কা রয়েছে

শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তারা জানান, আপাতত গুদামে মজুত থাকা পণ্য দিয়ে বাজারের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে বড় সরবরাহ সংকট দেখা যায়নি। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকায় মজুত ক্রমাগত কমছে। এক-দুই দিনের বিঘ্ন সামলানো গেলেও সংকট দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিত্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সরবরাহ সংকটের সুযোগে বাজারে যাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা ও বাজার নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সংকট নিরসনে সরকারের উদ্যোগ ও সময়সীমা সম্পর্কে জনগণকে জানানো উচিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্যাস–সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

আপডেট সময় : ০২:৪২:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

দেশে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ১২টি নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানায় চিনি, গম, সয়াবিনবীজ ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাত হয়। ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গ্যাসের চাপ কমায় উৎপাদন বন্ধ

কয়েক দিন ধরেই গ্যাসের চাপ কমতে থাকায় এমজিআইয়ের কারখানাগুলোর উৎপাদন কমছিল। তবে গত বুধবার সংকট তীব্র আকার নেয়। এর ফলে একে একে বন্ধ হয়ে যায় সয়াবিন বীজ মাড়াই, তেল উৎপাদন, আটা-ময়দা তৈরিসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে প্রধান সাত পণ্য ও কাঁচামালের মোট আমদানির ২২ শতাংশই ছিল এমজিআইয়ের। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব হিসাবে, তাদের কারখানায় দৈনিক প্রায় ৯ হাজার টন এবং বছরে প্রায় ৩৩ লাখ টন পণ্য প্রক্রিয়াজাত হয়। তাই এতগুলো কারখানা একযোগে বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা বেড়েছে।

এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বৃহস্পতিবার জানান, বুধবার থেকে গ্যাসনির্ভর সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান, যাতে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়।

শুধু এমজিআই নয়, সংকটে আরও অনেক শিল্পগোষ্ঠী

এই গ্যাস সংকট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের অন্যান্য বড় নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পগোষ্ঠীর কারখানাও একই কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কোনোরকমে উৎপাদন সচল রেখেছে, তবে তা সক্ষমতার অনেক নিচে।

টি কে গ্রুপের ২৮টি কারখানার মধ্যে ২০টিই বর্তমানে বন্ধ। গত অর্থবছরে আলোচ্য পণ্য আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এই গ্রুপ প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছিল। গ্রুপটির পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার জানান, মাত্র চারটি কারখানায় সীমিত আকারে উৎপাদন চলছে, বাকিগুলো পুরোপুরি বন্ধ।

নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ শতাংশে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখা হলেও খরচ বেড়ে গেছে, অথচ উৎপাদন কমে গেছে।

এছাড়া স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের তিনটি বড় কারখানাই বন্ধ রয়েছে। সীকম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এগ্রোফুডের তিনটি কারখানাও মঙ্গলবার থেকে বন্ধ। সিটি গ্রুপের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলোও চালু করা যায়নি।

এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটিই মূল কারণ

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও স্বাভাবিক সময়েও তা পুরোপুরি মেটানো যায় না। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি গত ২১ জুলাই আগুন ও কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়।

গ্যাস–সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে কারখানা
গ্যাস–সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর গত ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়। তবে তা এখনো অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, বুধবার গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ২০৩ কোটি ঘনফুটে, ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট।

শুধু নিত্যপণ্য নয়, এই ঘাটতির প্রভাব পড়েছে ইস্পাত, কাচ ও বস্ত্র শিল্পেও।

বাজারে এখনই বড় প্রভাব না পড়লেও শঙ্কা রয়েছে

শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তারা জানান, আপাতত গুদামে মজুত থাকা পণ্য দিয়ে বাজারের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে বড় সরবরাহ সংকট দেখা যায়নি। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকায় মজুত ক্রমাগত কমছে। এক-দুই দিনের বিঘ্ন সামলানো গেলেও সংকট দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিত্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সরবরাহ সংকটের সুযোগে বাজারে যাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা ও বাজার নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সংকট নিরসনে সরকারের উদ্যোগ ও সময়সীমা সম্পর্কে জনগণকে জানানো উচিত।