সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে বাণিজ্যিক কর্মচাঞ্চল্য কমে গেছে। পণ্যবাহী ট্রাকের যাতায়াত আগের তুলনায় অনেক কমেছে। ফলে কাজের অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মন্থর হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বন্দর
সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভোমরা স্থলবন্দর। এটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গড়ে উঠেছে। এর ঠিক বিপরীতে রয়েছে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা স্থলবন্দর।
গত ৯ আগস্ট রোববার সরেজমিনে দেখা গেছে, ভারত থেকে আসা কিছু পণ্যবাহী ট্রাক এখনো বন্দরে প্রবেশ করছে। তবে পণ্য খালাস ও কাগজপত্রের কাজে সংশ্লিষ্টরা আগের তুলনায় অনেকটাই ফাঁকা সময় পার করছেন।
শ্রমিকদের দুর্দশা বাড়ছে
বন্দর সড়কের পাশে হ্যান্ডলিং শ্রমিকদের কার্যালয়ের সামনে অনেক শ্রমিক অলস সময় কাটাচ্ছেন। কাজের অপেক্ষায় থাকা আজিজুল ইসলাম জানান, বর্তমানে কাজের অবস্থা খুবই খারাপ। এর সঙ্গে মজুরিও কমে গেছে, ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই অনেক শ্রমিক কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
শুধু হ্যান্ডলিং শ্রমিক নন, সিঅ্যান্ডএফ কর্মীরাও একই সংকটে পড়েছেন। ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা জানান, কিছুদিন আগে বন্দরের ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল। এর ফলে অনেক কর্মী বেকার হয়ে পড়েছেন। তাঁর মতে, বন্দরে সব ধরনের পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে অনেক পণ্য এই পথে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব চিত্রে বিস্তর ফারাক
২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই বন্দরের জন্য ২ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু জুলাই মাসে আদায় হয়েছে মাত্র প্রায় ৯৮ কোটি টাকা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বছরের শেষে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও পূরণ হবে না।
ভোমরা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্য ছিল ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। প্রকৃতপক্ষে আদায় হয়েছে ১ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৫১ কোটি টাকায়।
আমদানি-রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ২০ লাখ ৮২ হাজার ৭২২ টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। পরের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭ টনে। এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে ১ লাখ ৯ হাজার ৬৭৫ টন।
রপ্তানিতে পতন আরও তীব্র হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৮৯টি ট্রাকের মাধ্যমে ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৯৯ টন পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।
এর আগের অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ২৮ লাখ ৬ হাজার টন পণ্য। তখন আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৪০৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি কমেছে ১০ লাখ ২৫ হাজার ৯০১ টন এবং আয় কমেছে ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা।
অবকাঠামো সংকটই মূল কারণ
স্থানীয় ব্যবসায়ী, শুল্ক কর্মকর্তা ও আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্টদের মতে, মূলত অবকাঠামোগত অসুবিধার কারণেই বাণিজ্য কমেছে। সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি নাসিম ফারুক খান বলেন, ভারত থেকে আমদানি করা কিছু কৃষিপণ্যের বাজারদর কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। এছাড়া ভারী ক্রেন, পর্যাপ্ত ইয়ার্ড ও আধুনিক গুদামের অভাবও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও জানান, অবকাঠামোর দিক থেকে ভারতের ঘোজাডাঙা বন্দর ভোমরার তুলনায় দুর্বল। তবে বন্দর ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। এই কারণে অনেক ব্যবসায়ী এই বন্দর ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
কাস্টমসের বক্তব্য
কাস্টম হাউসের কমিশনার মুশফিকুর রহমান জানান, ব্যবসায়ীদের সেবার মান বাড়ানো, হয়রানি কমানো এবং দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে কাস্টমস কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে তিনি জানান। সেখানে বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যৌক্তিক সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।




















