যুক্তরাজ্য কি ভাঙনের পথে? স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা এখন একজোট হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা বেশি স্বায়ত্তশাসন আর স্বাধীনতা গণভোটের অধিকার চান। এতে যুক্তরাজ্যের সামনে নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বায়ত্তশাসিত এই তিন অঞ্চলের নেতারা ওয়েলসের কার্ডিফে এক ঐতিহাসিক সম্মেলনে মিলিত হবেন। সেখানে তারা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতা গণভোট করার এবং নিজেদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ ঠিক করার অধিকারের কথা বলা হবে।
রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এক সময়ে এই সম্মেলন হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সম্প্রতি সাংসদদের বলেছেন, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে ‘স্পষ্ট সম্মতি’ থাকলে তিনি আরেকটি গণভোটের অনুমতি দেবেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডের পুনর্মিলন নিয়ে মন্তব্য করার পর এই বিষয়টি আরও গতি পেয়েছে। শনিবার ডাবলিন সফরে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি একটি সংযুক্ত আয়ারল্যান্ড দেখতে ‘ভালোবাসবেন’। উত্তর আয়ারল্যান্ডের আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রে যোগ দেওয়াকে তিনি ‘দারুণ ব্যাপার’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এটা খারাপ হতে পারে কীভাবে?’
জাতীয়তাবাদী দলগুলো নিজেদের দেশের ভবিষ্যতে বেশি কথা বলার অধিকার চাইছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর বার্নহামের সরকারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম ইংল্যান্ডে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণকে তার রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে রেখেছেন। এসএনপি নেতা ও স্কটল্যান্ডের প্রথম মন্ত্রী জন সুইনি এই বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, বার্নহাম এখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন যে ইতিহাসে তিনিই হতে যাচ্ছেন যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী।
স্বাধীনতাপন্থী দলগুলোর অগ্রগতি
মের নির্বাচনে ওয়েলসে লেবার পার্টির খারাপ ফলাফলের পর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোতে ক্ষমতার ভারসাম্য অনেকটাই বদলে গেছে।
এই প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড তিন জায়গাতেই এখন স্বাধীনতাপন্থী দলগুলো ক্ষমতায় আছে। কার্ডিফ সেনেডে প্লেড সিমরু সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এর ফলে দলটির নেতা রুন আপ ইওয়ের্থ ওয়েলসের প্রথম মন্ত্রী হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
স্কটল্যান্ডে হলিরুডে ছয়টি আসন হারানোর পরও এসএনপি এখনো প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে। তবে রিফর্ম আর গ্রিনরা এবার কিছু আসন জিতেছে। ২০২৪ সালে মিশেল ও’নিল প্রথম মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডে সিন ফেইনের নেতৃত্ব চলছে।
২০২২ সালের স্টরমন্ট নির্বাচনে সিন ফেইন সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসে। যদিও ডিইউপির ওয়াকআউটের কারণে নির্বাহী পরিষদ গঠনে দেরি হয়েছিল। আগামী বছর উত্তর আয়ারল্যান্ডে আবার ভোট হলে দলটি ক্ষমতায় থাকবে বলেই বিস্তৃতভাবে মনে করা হচ্ছে।
কার্ডিফের এই সম্মেলনে তিন অঞ্চলের প্রথম মন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন সিন ফেইনের সভাপতি ও আয়ারল্যান্ডের বিরোধী দলীয় নেতা মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও। কার্ডিফ বে দেখা যায় এমন পাঁচ তারকা সেন্ট ডেভিডস হোটেলে নেতারা ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য নতুন প্রচার নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
‘পুরনো অবস্থা আর টেকসই নয়’
রোববার সুইনি বলেন, ‘এই প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস আর উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতৃত্বে আছেন স্বাধীনতাপন্থী প্রথম মন্ত্রীরা। এর চেয়ে স্পষ্ট আর কোনো লক্ষণ হতে পারে না যে পুরনো অবস্থা আর টেকসই নয়, আর ওয়েস্টমিনস্টারকে যুক্তরাজ্য-পরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের পেছনের এই গতি অস্বীকার করার উপায় নেই। অ্যান্ডি বার্নহামকে এখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে যে ইতিহাসে তিনিই হবেন যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী।’
তিনি বলেন, ‘আগামীকাল কার্ডিফে, এই দ্বীপগুলোর অংশীদারদের সঙ্গে একটি ভালো ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে মুখিয়ে আছি আমি, আর তা আসবে কেবল স্বাধীনতার নতুন সূচনার মধ্য দিয়েই।’
এই যৌথ ঘোষণাপত্রে তিন দেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তুলে ধরা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ওয়েস্টমিনস্টারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
বার্নহামের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বুধবার প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, জনমত সমর্থন করলে আরেকটি গণভোট হতে পারে।
হাউস অব কমন্সে তিনি বলেন, বিচ্ছেদ ভোটের শর্ত উত্তর আয়ারল্যান্ডের মতোই ‘একদম একই পরিস্থিতি’ স্কটল্যান্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
গুড ফ্রাইডে চুক্তি অনুযায়ী উত্তর আয়ারল্যান্ডের সামনে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে পুনর্মিলনের গণভোট করার একটি সাংবিধানিক পথ খোলা আছে। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, উত্তর আয়ারল্যান্ডের অধিকাংশ মানুষ যুক্তরাজ্য ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে থাকবেন বলে ‘সম্ভাবনা দেখা দিলে’ এমন ভোট করতে হবে।

























