অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের জমিতে গড়ে উঠছে অসংখ্য ইসরাইলি বসতি। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতিকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও গত কয়েক দশকে এর সংখ্যা ও বিস্তার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলাও রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে।
এসব বসতি বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা সাধারণ শহরতলির মতো—একই ধরনের বাড়ি, লাল টাইলের ছাদ, সাজানো বাগান। তবে অনেক বসতি পাহাড়ের চূড়ায় এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে আশপাশের ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামগুলো স্পষ্ট দেখা যায়।
ছয় দশকে ব্যাপক বিস্তার
১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগেও ইহুদি বসতির সংখ্যা ছিল খুবই কম। তবে ১৯৬৭ সালে ইসরাইল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এসব বসতির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
ইসরাইলি বসতিগুলো এখন শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পাহাড়ি এলাকা নয়। এগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়ক, মহাসড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো। ফলে বসতিগুলো একে অপরের সঙ্গে এবং ইসরাইলের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একটি বড় নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
ইসরাইলি বসতিবিরোধী সংগঠন পিস নাও-এর তথ্য অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অন্তত ১৪৮টি এবং পূর্ব জেরুজালেমে ১৫টি ইসরাইলি বসতি রয়েছে। অর্থাৎ মোট ১৬৩টি বসতিতে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ইসরাইলি বসবাস করছেন।
২০২৪ সালের হিসাবে এসব বসতিতে বসবাসকারী ইসরাইলির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৭০০। এর মধ্যে পশ্চিম তীরে ৫ লাখ ১১ হাজার ১০০ এবং পূর্ব জেরুজালেমে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৬০০ জন।
এ ছাড়া আরও ৪০০টির বেশি অবৈধ আউটপোস্ট রয়েছে। এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত বসতি নয়, তবে সময়ের সঙ্গে অনেক আউটপোস্টকে স্বীকৃত বসতির সঙ্গে যুক্ত বা বৈধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে ইসরাইলি বসতি ও আউটপোস্টের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বসতিগুলো সাধারণত ইসরাইলি সরকারের অনুমোদন, পরিকল্পনা ও অর্থায়নের মাধ্যমে বসতিতে পরিণত হয়। অন্যদিকে, আউটপোস্টগুলো ছোট আকারের বসতি, যেগুলো অনেক সময় সরকারি আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই গড়ে ওঠে। পরে এগুলোর কিছু বৈধতা পায় অথবা বড় কোনো বসতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক আইনে ইসরাইলি বসতিগুলোকে অবৈধ বলা হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এ অবস্থান জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করছে বসতি ও সড়ক
বড় কিছু ইসরাইলি বসতি এখন ছোট শহরের মতো। সেখানে মেয়র, স্কুল, শপিংমল, হাসপাতাল এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। সবচেয়ে বড় বসতিগুলোর মধ্যে মোদিইন ইলিত, বেইতার ইলিত ও পিসগাত জেভ উল্লেখযোগ্য।
এসব বসতিকে যুক্ত করতে অনেক সড়ক তৈরি করা হয়েছে, যার কিছু ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে গেছে। এসব সড়ক, চেকপোস্ট ও অবরোধের কারণে ফিলিস্তিনিদের চলাচল অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন ফিলিস্তিনি এলাকা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এর অন্যতম উদাহরণ ই১ এলাকা। জেরুজালেমের পূর্বদিকে অবস্থিত এই এলাকায় মালে আদুমিম বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পূর্ব জেরুজালেম পশ্চিম তীরের অন্যান্য অংশ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
২০২৫ সালের আগস্টে ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ই১ প্রকল্পে ৩ হাজারের বেশি নতুন বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন দেন। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে ‘কবর’ দেবে।
এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে প্রায় ৩০টি দেশ ও ইউরোপীয় কমিশন একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ‘অগ্রহণযোগ্য ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে বড় একটি অংশ মূলত অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে এসব এলাকায় বসবাস করেন। তুলনামূলক কম ভাড়া, সরকারি ভর্তুকি, সস্তা জমি ও ঋণের’ বলে অভিহিত করে।
বাড়ছে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা
ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে বড় একটি অংশ মূলত অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে এসব এলাকায় বসবাস করেন। তুলনামূলক কম ভাড়া, সরকারি ভর্তুকি, সস্তা জমি ও ঋণের সুবিধা তাদের আকৃষ্ট করে।
অন্যদিকে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী একটি গোষ্ঠী মনে করে, এই ভূমি ঈশ্বর তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। এদের মধ্যে ‘হিলটপ ইয়ুথ’ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠী নতুন আউটপোস্ট স্থাপন এবং ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলার জন্য পরিচিত।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর ওসিএইচএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সারের ৭ অক্টোবরের পর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শুধু ২০২৫ সালে ১,৮৩৬টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে ২০২২ সালে এমন হামলার সংখ্যা ছিল ৮৫২। অর্থাৎ ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচটি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত মোট ৫,১৩১টি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আরও ১,৪১৮টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নতুন বসতি স্থাপন এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা—দুটি আলাদা বিষয় হলেও, এগুলো একসঙ্গে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের ক্রমবর্ধমান চিত্র তুলে ধরছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

























