ব্যাংকিং, ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন দাপ্তরিক প্রয়োজনে অনেকেই কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বা টিন সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেন। তবে সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন শেষ হলেও টিআইএন সক্রিয় থেকে যায়। এতে আয়কর রিটার্ন দাখিলসহ বিভিন্ন করসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা নিয়ে অনেকে দুশ্চিন্তায় পড়েন। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে আইনগত জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
তবে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই ইচ্ছামতো টিআইএন বাতিল করা যায় না। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করতে হয়। আবেদন যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।
ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন হলো করদাতার স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আয়করসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, রিটার্ন দাখিল এবং বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে এটি ব্যবহার করা হয়।
ব্যাংকিং কার্যক্রম, ভিসার আবেদন, ব্যবসা পরিচালনাসহ নানা প্রয়োজনে টিআইএন দরকার হতে পারে। তবে টিআইএন থাকলেই কর দিতে হবে, এমন নয়। করদাতার আয়, সম্পদ ও প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে করের দায় নির্ধারিত হয়। তাই প্রয়োজন নেই ভেবে রিটার্ন জমা বন্ধ করার আগে আইনগত বাধ্যবাধকতা যাচাই করা জরুরি।
কোনো ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে এবং টিআইএন ব্যবহারের প্রয়োজন না থাকলে তা বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ভুলবশত একাধিক টিআইএন তৈরি হলেও অতিরিক্ত নিবন্ধন বাতিলের সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট প্রয়োজনে টিআইএন নেওয়ার পর সেটির প্রয়োজন শেষ হলে, করযোগ্য আয় না থাকলে কিংবা দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানের কারণে দেশে টিআইএন রাখার প্রয়োজন না হলে নির্ধারিত শর্তে আবেদন বিবেচিত হতে পারে।
তবে আয় করমুক্ত সীমার নিচে নেমে গেলেই টিআইএন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র জমা দিতে হতে পারে।
কোনো করদাতার মৃত্যু হলে তাঁর উত্তরাধিকারীরা টিআইএন বাতিলের আবেদন করতে পারবেন। তবে মৃত ব্যক্তির নামে ব্যবসা বা অন্য কোনো আর্থিক কার্যক্রম চালু থাকলে সংশ্লিষ্ট কর ও আইনগত বিষয় আগে যাচাই করতে হবে।
টিআইএন বাতিলের জন্য অনলাইনে সরাসরি আবেদন করার সুবিধা রয়েছে কি না, তা আগে এনবিআরের বর্তমান নির্দেশনা থেকে নিশ্চিত হতে হবে। শুধু অনলাইনে টিআইএন নিবন্ধন বা সনদ সংগ্রহের সুবিধা থাকলেই একইভাবে নিবন্ধন বাতিল করা যাবে, এমন নয়।
এ জন্য এনবিআরের সরকারি ওয়েবসাইটে গিয়ে টিআইএনসংক্রান্ত সেবার নিয়ম যাচাই করা যেতে পারে। অনলাইনে বাতিলের আবেদনের সুযোগ থাকলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
তবে অনলাইনে আবেদন করার সুবিধা না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল বা কর কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে। আবেদন অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত টিআইএন বাতিল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
টিআইএন বাতিলের ক্ষেত্রে সাধারণত টিআইএন সনদ বা নম্বরের প্রমাণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি এবং বাতিলের কারণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে।
ব্যবসা বন্ধের কারণে আবেদন করলে প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে। একইভাবে করদাতার মৃত্যু, বিদেশে অবস্থান কিংবা অন্য কোনো কারণে আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট তথ্যের সমর্থনে নথি জমা দিতে হতে পারে।
এ ছাড়া কর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে আগের আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ চাইতে পারে। তবে সব আবেদনকারীর জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক বছরের শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক, এমন ধারণা সঠিক নয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
টিআইএন বাতিলের আবেদন অনুমোদিত হলেও আগের করসংক্রান্ত দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। পূর্ববর্তী কোনো অর্থবছরের বকেয়া কর, রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কিংবা আইনগত বিষয় নিষ্পত্তির প্রয়োজন হতে পারে।
আবেদন অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সংগ্রহ করা উচিত।
ভবিষ্যতে আবার টিআইএন প্রয়োজন হলে পুরোনো নম্বর পুনরায় ব্যবহারের সুযোগ থাকবে, নাকি অন্য কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, তা এনবিআরের প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
শুধু আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এড়াতে টিআইএন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বর্তমান আয়, সম্পদ, ব্যবসার অবস্থা এবং ভবিষ্যতে টিআইএনের প্রয়োজন হতে পারে কি না, তা বিবেচনায় রাখা জরুরি।
টিআইএন বাতিলের যোগ্যতা ও আবেদনপদ্ধতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে পরবর্তী সময়ে করসংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।
























