তবে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরও মুরাতভের ওপর চাপ কমেনি। ২০২৩ সালে তাকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ ঘোষণা করে রুশ কর্তৃপক্ষ। দেশটিতে সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রায়ই এই পরিচয় ব্যবহার করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য সুনাম ছিল নোভায়া গেজেতার। দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাদের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করত পত্রিকাটি। রাশিয়ায় এসব বিষয় নিয়ে সাংবাদিকতা করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
পত্রিকাটির দাবি, পেশাগত ও নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের ছয়জন সহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। নিহত সাংবাদিকদের একজন আনা পলিতকভস্কায়া। ঠিক ২০ বছর আগে, চলতি অক্টোবর মাসেই নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সিঁড়িতে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। চেচনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি।
নোভায়া গেজেতার কার্যালয়ের একটি কক্ষে কাজ করতেন আনা। তার মৃত্যুর পর কক্ষটি ও এর ভেতরের জিনিসপত্র স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। পরে কক্ষটিকে তার স্মরণে ছোট একটি জাদুঘরে পরিণত করা হয়। কিন্তু কার্যালয় ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশের পর কক্ষটির বেশির ভাগ জিনিস সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে শুধু পড়ে আছে আনার কাজের টেবিল। টেবিলের ওপর রাখা আছে তার একটি ছবি।
পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে নোভায়া গেজেতা। এতে রুশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিবৃতির শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘তারা আমাদের হত্যা করেছে। সংবাদপত্রটির আর অস্তিত্ব নেই। রুশ কর্তৃপক্ষ ও দেশটির বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আমাদের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য করেছে।’ পত্রিকাটির দাবি, তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর জন্য রাশিয়ার দমনমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দায়ী করেছে তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাশিয়ায় মানবাধিকার ও স্বাধীনতা ধ্বংস করা হয়েছে। এসব অধিকার রক্ষার চেষ্টা করাকেও অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এখন নিজের বিশ্বাস ও মতামত প্রকাশ করাকেও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর দেশটিতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ বেড়েছে। ক্রেমলিন এই যুদ্ধকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে উল্লেখ করে। হামলা শুরুর কিছুদিন পরই রাশিয়ায় নতুন আইন করা হয়। এসব আইনের মাধ্যমে যুদ্ধ ও সরকারের সমালোচনাকারীদের শাস্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
চলতি বছরের শুরুর দিকে নোভায়া গেজেতার কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ সময় পত্রিকাটির অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ওলেগ রলদুগিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে কম্পিউটারে সংরক্ষিত তথ্যে বেআইনিভাবে প্রবেশের অভিযোগ আনা হয়। এ ঘটনায় সম্প্রতি পত্রিকাটির বর্তমান প্রধান সম্পাদক সের্গেই সোকোলভকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় পুলিশ। তার বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়।
এত চাপের মধ্যেও নোভায়া গেজেতা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে আগের তুলনায় অনেক সীমিত পরিসরে। পত্রিকাটির নিয়মিত পাঠকেরা ভিপিএন ব্যবহার করে সরকারি বাধা এড়িয়ে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতেন। কিন্তু লাইসেন্স বাতিলসহ নানা বিধিনিষেধের কারণে পত্রিকাটির কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
নোভায়া গেজেতার ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চাইলে দিমিত্রি মুরাতভ বলেন, তারা এখন ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্বৈরাচারী শাসক বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চান। নিজেদের দেশ ও জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে এবং ব্যক্তিগত ক্ষমতা শক্তিশালী করতে তারা এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগান।
মুরাতভ বলেন, ‘এরপর কী ঘটবে, তা আমি জানি না। তবে নিজেদের মূল্যবোধ ধরে রাখতে আমরা সবকিছু করব। আমাদের মূল্যবোধ হলো, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। রাষ্ট্রের অধিকারের চেয়ে মানবাধিকার বড়।’ নোভায়া গেজেতার বন্ধ হয়ে যাওয়া রাশিয়ার স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বড় ধাক্কা। তিন দশক ধরে সরকারের সমালোচনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করা সংবাদমাধ্যমটির এই পরিণতি দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকটকেও সামনে এনেছে।
ক্রমেই কঠোর হয়ে ওঠা রাশিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য কাজের সুযোগ যে আরো সংকুচিত হচ্ছে, নোভায়া গেজেতার বন্ধ হয়ে যাওয়া তারই একটি বড় উদাহরণ।



























