ঢাকা ০৬:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফখরুদ্দিন–মঈনউদ্দিন আমলে ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হওয়া কর্মকর্তা আবারও আলোচনায়

ফখরুদ্দিন–মঈনউদ্দিন আমলে ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হওয়া কর্মকর্তা আবারও আলোচনায়

সদ্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরে (সওজ) গড়ে ওঠা বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত সিন্ডিকেট—‘কাদের চক্র’—সরকার পরিবর্তনের পরও কার্যত অক্ষত রয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে সংস্কারের উদ্যোগ দৃশ্যমান হলেও সওজে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। বরং “সংস্কার”-এর আড়ালে আওয়ামীপন্থী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে।

এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় আবারও আলোচনায় এসেছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান—যিনি ফখরুদ্দিন–মঈনউদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি অনুসন্ধান কমিশন (ট্রুথ কমিশন)-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, অতীতের সেই প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগে প্রশাসনিক সংস্কার শুরু হলেও সড়ক ভবনে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। একাধিক বদলি ও পদায়নের প্রজ্ঞাপনে দেখা গেছে, আওয়ামী ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারাই আবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরছেন। সর্বশেষ বদলিতে এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়।

যদিও প্রশাসনিকভাবে আজাদ রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে, তবুও সওজের অভ্যন্তরীণ মহলে তিনি “সর্বোচ্চ আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা” হিসেবে পরিচিত। গত এক যুগে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ বলয়ভুক্ত একাধিক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঘিরে আরেকটি নাম এখন নিয়মিতভাবে উঠে আসছে—ইঞ্জিনিয়ারিং নুরু ইসলাম। সওজের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, নুরু ইসলাম আজাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং বদলি বাণিজ্য, ঠিকাদার ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন ‘সংবেদনশীল’ প্রশাসনিক কাজ মূলত তাকেই দিয়ে করানো হয়।

সূত্রের দাবি, আজাদের বিরুদ্ধে ওঠা বহু অভিযোগের বাস্তবায়নকারী হিসেবে নুরু ইসলাম কাজ করতেন, ফলে সরাসরি দায় এড়িয়ে আজাদ রহমান নিজেকে আড়ালে রাখতে পারতেন।

সওজের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে ‘কাদের চক্র’ সড়ক উন্নয়ন খাতে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটে রূপ নেয়। এই সিন্ডিকেট তিনটি স্তরে কাজ করে—
১) বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ
২) প্রকল্প ও ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ
৩) অর্থপাচার ও বিদেশ সফর ব্যবস্থাপনা

এই তিন স্তরের সমন্বয়ে প্রভাবশালী প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পরপরই অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তাকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়। দাপ্তরিকভাবে এগুলোকে “প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়” বলা হলেও অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে।

তাদের দাবি, এসব সফরের মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিবারের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং আইইবি নির্বাচনে দলীয় প্যানেল থেকে নির্বাচিত হন। প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকেও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অভিযোগে তিনি একাধিকবার সমালোচিত হয়েছেন।
সূত্রের দাবি, মঈনুল হাসানের নেতৃত্বেই বর্তমানে সওজে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে—যেখানে “ঠিকাদার সংকট” দেখিয়ে কৃত্রিম অব্যবস্থাপনা তৈরি করে জনদুর্ভোগ বাড়ানো হচ্ছে, যাতে সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়। এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে আজাদ রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠ নুরু ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ।

সওজের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, “আজ যারা সংস্কারের কথা বলছেন, তারাই অতীতে দুর্নীতির অংশ ছিলেন।” বদলি, টেন্ডার ও বিদেশ সফর—সবকিছু এখনো পুরনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘কাদের চক্র’ কেবল একটি প্রশাসনিক সিন্ডিকেট নয়; এটি একটি রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, যা আমলাতন্ত্র, ঠিকাদারি ও বিদেশি লবিং—এই তিন স্তরে কাজ করে। একজন সাবেক সচিবের ভাষায়,

“যতদিন সওজে আজাদ–মঈনুল–নুরুদের মতো কর্মকর্তারা বহাল থাকবেন, ততদিন প্রকৃত সংস্কার কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
রাষ্ট্রযন্ত্রের যেসব কর্মকর্তার অতীতে ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল, তারা আজও যদি একইভাবে প্রভাব বিস্তার করেন—তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই প্রশাসনিক সংস্কার আদৌ কার জন্য?

জনপ্রিয় সংবাদ

ফখরুদ্দিন–মঈনউদ্দিন আমলে ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হওয়া কর্মকর্তা আবারও আলোচনায়

আপডেট সময় : ০৩:০৯:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

সদ্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরে (সওজ) গড়ে ওঠা বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত সিন্ডিকেট—‘কাদের চক্র’—সরকার পরিবর্তনের পরও কার্যত অক্ষত রয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে সংস্কারের উদ্যোগ দৃশ্যমান হলেও সওজে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। বরং “সংস্কার”-এর আড়ালে আওয়ামীপন্থী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে।

এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় আবারও আলোচনায় এসেছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান—যিনি ফখরুদ্দিন–মঈনউদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি অনুসন্ধান কমিশন (ট্রুথ কমিশন)-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, অতীতের সেই প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগে প্রশাসনিক সংস্কার শুরু হলেও সড়ক ভবনে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। একাধিক বদলি ও পদায়নের প্রজ্ঞাপনে দেখা গেছে, আওয়ামী ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারাই আবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরছেন। সর্বশেষ বদলিতে এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়।

যদিও প্রশাসনিকভাবে আজাদ রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে, তবুও সওজের অভ্যন্তরীণ মহলে তিনি “সর্বোচ্চ আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা” হিসেবে পরিচিত। গত এক যুগে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ বলয়ভুক্ত একাধিক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঘিরে আরেকটি নাম এখন নিয়মিতভাবে উঠে আসছে—ইঞ্জিনিয়ারিং নুরু ইসলাম। সওজের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, নুরু ইসলাম আজাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং বদলি বাণিজ্য, ঠিকাদার ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন ‘সংবেদনশীল’ প্রশাসনিক কাজ মূলত তাকেই দিয়ে করানো হয়।

সূত্রের দাবি, আজাদের বিরুদ্ধে ওঠা বহু অভিযোগের বাস্তবায়নকারী হিসেবে নুরু ইসলাম কাজ করতেন, ফলে সরাসরি দায় এড়িয়ে আজাদ রহমান নিজেকে আড়ালে রাখতে পারতেন।

সওজের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে ‘কাদের চক্র’ সড়ক উন্নয়ন খাতে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটে রূপ নেয়। এই সিন্ডিকেট তিনটি স্তরে কাজ করে—
১) বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ
২) প্রকল্প ও ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ
৩) অর্থপাচার ও বিদেশ সফর ব্যবস্থাপনা

এই তিন স্তরের সমন্বয়ে প্রভাবশালী প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পরপরই অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তাকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়। দাপ্তরিকভাবে এগুলোকে “প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়” বলা হলেও অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে।

তাদের দাবি, এসব সফরের মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিবারের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং আইইবি নির্বাচনে দলীয় প্যানেল থেকে নির্বাচিত হন। প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকেও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অভিযোগে তিনি একাধিকবার সমালোচিত হয়েছেন।
সূত্রের দাবি, মঈনুল হাসানের নেতৃত্বেই বর্তমানে সওজে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে—যেখানে “ঠিকাদার সংকট” দেখিয়ে কৃত্রিম অব্যবস্থাপনা তৈরি করে জনদুর্ভোগ বাড়ানো হচ্ছে, যাতে সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়। এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে আজাদ রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠ নুরু ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ।

সওজের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, “আজ যারা সংস্কারের কথা বলছেন, তারাই অতীতে দুর্নীতির অংশ ছিলেন।” বদলি, টেন্ডার ও বিদেশ সফর—সবকিছু এখনো পুরনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘কাদের চক্র’ কেবল একটি প্রশাসনিক সিন্ডিকেট নয়; এটি একটি রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, যা আমলাতন্ত্র, ঠিকাদারি ও বিদেশি লবিং—এই তিন স্তরে কাজ করে। একজন সাবেক সচিবের ভাষায়,

“যতদিন সওজে আজাদ–মঈনুল–নুরুদের মতো কর্মকর্তারা বহাল থাকবেন, ততদিন প্রকৃত সংস্কার কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
রাষ্ট্রযন্ত্রের যেসব কর্মকর্তার অতীতে ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল, তারা আজও যদি একইভাবে প্রভাব বিস্তার করেন—তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই প্রশাসনিক সংস্কার আদৌ কার জন্য?