মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড থেকে খালাস চেয়ে আপিল করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আবেদন করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ।
এর আগে একই মামলায় ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করা হয়।
রায়ে ইনুর বিরুদ্ধে ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রতিটি অভিযোগে তাকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনটি সাজা একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ায় তাকে মোট ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রাইসুল হকসহ অন্য ভুক্তভোগীদের গুরুতর আহত করা, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক কারণে নিপীড়নের ঘটনায় ইনুর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। এ অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও সহযোগিতার দায়ে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অপর একটি অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র ও চুক্তিতে জড়িত থাকার দায়েও একই মেয়াদের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করেন ট্রাইব্যুনাল।
অন্যদিকে, ইনুর বিরুদ্ধে আনা ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সেগুলো থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
ইনুর বিরুদ্ধে আনা আট অভিযোগে যা ছিল
মামলার প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করেন ইনু। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত থেকে ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ইনু নির্দেশনা, উসকানি, প্ররোচনা এবং সহায়তা দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং তাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের জন্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে টেলিফোনে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইনু।
চতুর্থ অভিযোগে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, ছত্রীসেনা মোতায়েন এবং হেলিকপ্টার থেকে বোমা হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপকে কৌশলে সমর্থন করেছিলেন তিনি।
ষষ্ঠ অভিযোগে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইনুর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।
সপ্তম অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
অষ্টম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলনকারী ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিনকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন ইনু। একই সঙ্গে সারা দেশে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
তবে বিচার শেষে আটটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি থেকে ইনুকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি তিনটি অভিযোগে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এবার সেই সাজা থেকেও খালাস চেয়ে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করলেন সাবেক এই তথ্যমন্ত্রী।



























