ঢাকা ০৪:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লিবিয়ার সিংহাসনে বসতে চাওয়া সাদ্দাম হাফতার কে?



ফটোকার্ড ডাউনলোড

লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কর্তৃপক্ষ প্রায় সাত বছর ধরে ত্রিপোলিভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে তুরস্কের করা সামুদ্রিক চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিল। অথচ গত সপ্তাহে আইনসভার এক বৈঠকেই সেই চুক্তি অনুমোদন করেছে তারা। গত ২০ অক্টোবর বেনগাজিতে লিবিয়ার প্রতিনিধি পরিষদ চুক্তিটি অনুমোদন করে।

তবে এই অনুমোদনকে তুরস্কের কূটনৈতিক বিজয় বলার চেয়ে খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতারের  পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। পূর্ব লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দামের চূড়ান্ত লক্ষ্য দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ত্রিপোলি ও বেনগাজির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরব ও আফ্রিকাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাসাদ বুলোসের উদ্যোগে নেওয়া এই সমঝোতার মাধ্যমে সাদ্দামকে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট করা হতে পারে।

তবে এ লক্ষ্য অর্জনে সাদ্দামের আঙ্কারার সমর্থন প্রয়োজন। পশ্চিম লিবিয়ায় তুরস্কের উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকায় দেশটির রাজনৈতিক সমঝোতায় আঙ্কারার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সামুদ্রিক চুক্তির অনুমোদনকে তুরস্কের সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কে এই সাদ্দাম রাফতার

১৯৯১ সালে বেনগাজিতে আল-ফুরজানি গোত্রে জন্ম নেওয়া সাদ্দাম হাফতার ছয় ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। বড় ভাইদের পেছনে ফেলে কীভাবে তিনি বাবার পছন্দের উত্তরসূরি হয়ে উঠেছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে তার দুই ভাই উকবা ও আল-মুনতাসির যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। ফলে বাবার উত্তরসূরি হওয়ার প্রতিযোগিতায় তাদের সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হয়। আরেক ভাই বেলকাসিম খলিফা হাফতারের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সাদ্দামের বেপরোয়া আচরণও তার অবস্থান শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। এর একটি উদাহরণ ২০১১ সালে ত্রিপোলিতে একটি ব্যাংকে গোলাগুলির ঘটনা। ওই ঘটনায় সাদ্দাম আহত হয়েছিলেন।

এ ছাড়া বাবার শাসনব্যবস্থার অর্থায়নেও সাদ্দামের ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। ফলে সাদ্দাম ও তার আরেক ভাই খালেদ বাবার সবচেয়ে প্রভাবশালী সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দুজনই সেনা কর্মকর্তা এবং লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেসের (এলএএএফ) বিভিন্ন বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন। এই বাহিনীকে প্রায়ই খলিফা হাফতারের নিজের দেওয়া ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ নামেও উল্লেখ করা হয়।

সাদ্দাম বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদায় রয়েছেন। লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেসে দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। ২০১৬ সালে ক্যাপ্টেন এবং পাঁচ বছর পর কর্নেল পদে উন্নীত হন সাদ্দাম। অথচ সামরিক প্রতিষ্ঠান বা একাডেমিতে তার পূর্ববর্তী প্রশিক্ষণ ছিল না। তিনি বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। এমনকি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সনদও তিনি অর্জন করেননি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ঘাটতি পুষিয়ে নিতে ২০১৬ সালে সাদ্দাম ‘১০৬তম ব্যাটালিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী এবং তার বাবার একধরনের ব্যক্তিগত রক্ষীবাহিনী।

এই ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব দিয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিহাদি যোদ্ধাদের কাছ থেকে তীব্র লড়াইয়ের পর বেনগাজি পুনর্দখল করেন সাদ্দাম। তবে একই মাসে বেনগাজির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবন থেকে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের নগদ অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ব্যাটালিয়নটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। অর্থের বড় অংশের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, ওই অর্থের কিছু অংশ ব্যবহার করে ২০১৮ সালে ১০৬তম ব্যাটালিয়নকে ব্রিগেডে সম্প্রসারণ করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে বাহিনীটিকে এলএএএফের সবচেয়ে পেশাদার ব্রিগেডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিপুল পরিমাণ আধুনিক বিদেশি অস্ত্র পাওয়ায় এর সক্ষমতাও বেড়েছে। দ্বিতীয় লিবীয় গৃহযুদ্ধের সময় রাশিয়া ও আমিরাতের সমর্থনের ফলে এসব অস্ত্রের অনেকগুলো তাদের হাতে আসে।

২০১৬ সালে সাদ্দাম আরও একটি বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন—তারিক বেন জায়েদ (টিবিজেড) ব্রিগেড। অষ্টম শতাব্দীতে আইবেরীয় উপদ্বীপ বিজয়ী মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদের নামে বাহিনীটির নামকরণ করা হয়েছে।

টিবিজেডে মুয়াম্মার গাদ্দাফির বাহিনীর সাবেক সেনাসদস্য এবং খলিফা হাফতারের মিত্র গোত্রগুলোর যোদ্ধারা রয়েছেন। এটিকেও এলএএএফের অন্যতম সক্ষম সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে বাহিনীটির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২২ সালের ডিসেম্বরে টিবিজেডের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের জন্য এর কমান্ডারদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানায়। এ ছাড়া বেনগাজিতে মানুষকে উচ্ছেদ ও তাদের বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনায় জাতিসংঘও বাহিনীটির নিন্দা জানিয়েছে।

সাদ্দামের ভাই খালেদও লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেসে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। তবে সাদ্দাম সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবারের কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক উদ্যোগেও যুক্ত রয়েছেন।

খালেদ প্রথমে খালিদ ইবনে আল-ওয়ালিদ ব্রিগেডের (কেডব্লিউবি) কমান্ডার ছিলেন। পরে ১০৬তম ব্রিগেড ও কেডব্লিউবিকে একীভূত করে গঠিত নতুন ‘সিকিউরিটি ইউনিটস’-এর প্রধান নিযুক্ত হন।

২০১৬ সালে জর্ডানের সামরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য সাদ্দামকে নিজের দূত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তার বাবা বলে খবর প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালের আগে কোনো এক সময়ে তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গেও সাদ্দামের সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

২০২১ সালের মার্চে আমিরাত ও তেল আবিব সফর করে সামরিক সহায়তার বিনিময়ে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সাদ্দাম—এমন অভিযোগও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, আমিরাত ও জর্ডানে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সম্পদের কারণে হাফতার পরিবারকে ‘সামরিক-বাণিজ্যিক’ পরিবার হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের স্বার্থ দেখাশোনা করেন উকবা হাফতার।

অন্যদিকে, সাদ্দামের বিরুদ্ধে আরও অস্পষ্ট ও বিতর্কিত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে সোনার বিনিময়ে নগদ অর্থের লেনদেন এবং তুরস্কের কাছে স্ক্র্যাপ ধাতু ও তেল বিক্রি।

এ ছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মানবপাচার ও মাদক চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া অর্থ পূর্ব লিবিয়ায় হাফতার পরিবারের রাজনৈতিক-সামরিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। লিবিয়া থেকে ইউরোপে অভিবাসী ও মাদকের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেন সাদ্দাম—এমন দাবিও করা হয়েছে।

তার বাবার মতো সাদ্দাম হাফতারও পুরো লিবিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় নন। এর একটি কারণ হতে পারে ২০২০ সালে তার জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, ওই অনুষ্ঠানে তার বাবা অতিথিদের মধ্যে ১ কোটি ডলারের নগদ অর্থ ও উপহার বিতরণ করেছিলেন।

অনুষ্ঠানে কবিরা সাদ্দামের প্রশংসা করে গান ও কবিতা পরিবেশন করেন। পূর্ব লিবিয়ার ৪০ জন কবিকে হাফতার পরিবারের গুণকীর্তন করার জন্য ৪০টি টয়োটা হাইলাক্স গাড়ি দেওয়া হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। এ ধরনের গাড়ি সশস্ত্র সংঘাতে যোদ্ধা ও অস্ত্র বহনে বহুল ব্যবহৃত হওয়ায় পরিচিত। তথ্যসূত্র: জেমসটাউন

জনপ্রিয় সংবাদ

২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, আশা প্রধানমন্ত্রীর

লিবিয়ার সিংহাসনে বসতে চাওয়া সাদ্দাম হাফতার কে?

আপডেট সময় : ০১:৩৪:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬


ফটোকার্ড ডাউনলোড

লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কর্তৃপক্ষ প্রায় সাত বছর ধরে ত্রিপোলিভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে তুরস্কের করা সামুদ্রিক চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিল। অথচ গত সপ্তাহে আইনসভার এক বৈঠকেই সেই চুক্তি অনুমোদন করেছে তারা। গত ২০ অক্টোবর বেনগাজিতে লিবিয়ার প্রতিনিধি পরিষদ চুক্তিটি অনুমোদন করে।

তবে এই অনুমোদনকে তুরস্কের কূটনৈতিক বিজয় বলার চেয়ে খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতারের  পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। পূর্ব লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দামের চূড়ান্ত লক্ষ্য দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ত্রিপোলি ও বেনগাজির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরব ও আফ্রিকাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাসাদ বুলোসের উদ্যোগে নেওয়া এই সমঝোতার মাধ্যমে সাদ্দামকে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট করা হতে পারে।

তবে এ লক্ষ্য অর্জনে সাদ্দামের আঙ্কারার সমর্থন প্রয়োজন। পশ্চিম লিবিয়ায় তুরস্কের উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকায় দেশটির রাজনৈতিক সমঝোতায় আঙ্কারার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সামুদ্রিক চুক্তির অনুমোদনকে তুরস্কের সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কে এই সাদ্দাম রাফতার

১৯৯১ সালে বেনগাজিতে আল-ফুরজানি গোত্রে জন্ম নেওয়া সাদ্দাম হাফতার ছয় ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। বড় ভাইদের পেছনে ফেলে কীভাবে তিনি বাবার পছন্দের উত্তরসূরি হয়ে উঠেছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে তার দুই ভাই উকবা ও আল-মুনতাসির যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। ফলে বাবার উত্তরসূরি হওয়ার প্রতিযোগিতায় তাদের সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হয়। আরেক ভাই বেলকাসিম খলিফা হাফতারের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সাদ্দামের বেপরোয়া আচরণও তার অবস্থান শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। এর একটি উদাহরণ ২০১১ সালে ত্রিপোলিতে একটি ব্যাংকে গোলাগুলির ঘটনা। ওই ঘটনায় সাদ্দাম আহত হয়েছিলেন।

এ ছাড়া বাবার শাসনব্যবস্থার অর্থায়নেও সাদ্দামের ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। ফলে সাদ্দাম ও তার আরেক ভাই খালেদ বাবার সবচেয়ে প্রভাবশালী সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দুজনই সেনা কর্মকর্তা এবং লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেসের (এলএএএফ) বিভিন্ন বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন। এই বাহিনীকে প্রায়ই খলিফা হাফতারের নিজের দেওয়া ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ নামেও উল্লেখ করা হয়।

সাদ্দাম বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদায় রয়েছেন। লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেসে দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। ২০১৬ সালে ক্যাপ্টেন এবং পাঁচ বছর পর কর্নেল পদে উন্নীত হন সাদ্দাম। অথচ সামরিক প্রতিষ্ঠান বা একাডেমিতে তার পূর্ববর্তী প্রশিক্ষণ ছিল না। তিনি বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। এমনকি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সনদও তিনি অর্জন করেননি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ঘাটতি পুষিয়ে নিতে ২০১৬ সালে সাদ্দাম ‘১০৬তম ব্যাটালিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী এবং তার বাবার একধরনের ব্যক্তিগত রক্ষীবাহিনী।

এই ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব দিয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিহাদি যোদ্ধাদের কাছ থেকে তীব্র লড়াইয়ের পর বেনগাজি পুনর্দখল করেন সাদ্দাম। তবে একই মাসে বেনগাজির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবন থেকে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের নগদ অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ব্যাটালিয়নটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। অর্থের বড় অংশের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, ওই অর্থের কিছু অংশ ব্যবহার করে ২০১৮ সালে ১০৬তম ব্যাটালিয়নকে ব্রিগেডে সম্প্রসারণ করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে বাহিনীটিকে এলএএএফের সবচেয়ে পেশাদার ব্রিগেডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিপুল পরিমাণ আধুনিক বিদেশি অস্ত্র পাওয়ায় এর সক্ষমতাও বেড়েছে। দ্বিতীয় লিবীয় গৃহযুদ্ধের সময় রাশিয়া ও আমিরাতের সমর্থনের ফলে এসব অস্ত্রের অনেকগুলো তাদের হাতে আসে।

২০১৬ সালে সাদ্দাম আরও একটি বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন—তারিক বেন জায়েদ (টিবিজেড) ব্রিগেড। অষ্টম শতাব্দীতে আইবেরীয় উপদ্বীপ বিজয়ী মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদের নামে বাহিনীটির নামকরণ করা হয়েছে।

টিবিজেডে মুয়াম্মার গাদ্দাফির বাহিনীর সাবেক সেনাসদস্য এবং খলিফা হাফতারের মিত্র গোত্রগুলোর যোদ্ধারা রয়েছেন। এটিকেও এলএএএফের অন্যতম সক্ষম সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে বাহিনীটির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২২ সালের ডিসেম্বরে টিবিজেডের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের জন্য এর কমান্ডারদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানায়। এ ছাড়া বেনগাজিতে মানুষকে উচ্ছেদ ও তাদের বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনায় জাতিসংঘও বাহিনীটির নিন্দা জানিয়েছে।

সাদ্দামের ভাই খালেদও লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেসে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। তবে সাদ্দাম সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবারের কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক উদ্যোগেও যুক্ত রয়েছেন।

খালেদ প্রথমে খালিদ ইবনে আল-ওয়ালিদ ব্রিগেডের (কেডব্লিউবি) কমান্ডার ছিলেন। পরে ১০৬তম ব্রিগেড ও কেডব্লিউবিকে একীভূত করে গঠিত নতুন ‘সিকিউরিটি ইউনিটস’-এর প্রধান নিযুক্ত হন।

২০১৬ সালে জর্ডানের সামরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য সাদ্দামকে নিজের দূত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তার বাবা বলে খবর প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালের আগে কোনো এক সময়ে তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গেও সাদ্দামের সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

২০২১ সালের মার্চে আমিরাত ও তেল আবিব সফর করে সামরিক সহায়তার বিনিময়ে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সাদ্দাম—এমন অভিযোগও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, আমিরাত ও জর্ডানে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সম্পদের কারণে হাফতার পরিবারকে ‘সামরিক-বাণিজ্যিক’ পরিবার হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের স্বার্থ দেখাশোনা করেন উকবা হাফতার।

অন্যদিকে, সাদ্দামের বিরুদ্ধে আরও অস্পষ্ট ও বিতর্কিত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে সোনার বিনিময়ে নগদ অর্থের লেনদেন এবং তুরস্কের কাছে স্ক্র্যাপ ধাতু ও তেল বিক্রি।

এ ছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মানবপাচার ও মাদক চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া অর্থ পূর্ব লিবিয়ায় হাফতার পরিবারের রাজনৈতিক-সামরিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। লিবিয়া থেকে ইউরোপে অভিবাসী ও মাদকের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেন সাদ্দাম—এমন দাবিও করা হয়েছে।

তার বাবার মতো সাদ্দাম হাফতারও পুরো লিবিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় নন। এর একটি কারণ হতে পারে ২০২০ সালে তার জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, ওই অনুষ্ঠানে তার বাবা অতিথিদের মধ্যে ১ কোটি ডলারের নগদ অর্থ ও উপহার বিতরণ করেছিলেন।

অনুষ্ঠানে কবিরা সাদ্দামের প্রশংসা করে গান ও কবিতা পরিবেশন করেন। পূর্ব লিবিয়ার ৪০ জন কবিকে হাফতার পরিবারের গুণকীর্তন করার জন্য ৪০টি টয়োটা হাইলাক্স গাড়ি দেওয়া হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। এ ধরনের গাড়ি সশস্ত্র সংঘাতে যোদ্ধা ও অস্ত্র বহনে বহুল ব্যবহৃত হওয়ায় পরিচিত। তথ্যসূত্র: জেমসটাউন