ঢাকা ০৫:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি, জরিমানা ৮.৭৭ কোটি টাকা

ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আর্টিস্টিক অ্যাপারেলস লিমিটেড বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ। এর ফলে সরকার হারিয়েছে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার টাকার বেশি রাজস্ব। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটিকে সব মিলিয়ে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।

নগরের নিউ চাক্তাইয়ের হাজী দেলোয়ার হোসেন সওদাগর মার্কেটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে আসছিল। তবে সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় গত বছরের আগস্টে বন্ড কমিশনারেটের একটি বিশেষ দল কারখানা পরিদর্শনে যায়।

পরিদর্শনে দেখা যায়, গুদামে থাকার কথা ছিল ১ লাখ ৬২ হাজার কেজির বেশি কাঁচামাল। অথচ বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র ১৪ হাজার ৭৮৬ কেজি ফেব্রিক্স। এছাড়া বন্ড রেজিস্টারও গায়েব করে ফেলা হয়েছিল। ফলে প্রতিষ্ঠানের কমার্শিয়াল ম্যানেজার সদ্য কেনা একটি খালি রেজিস্টার দেখান কর্মকর্তাদের।

তদন্তে উঠে এলো ১ লাখ ৪৭ হাজার কেজির গরমিল

কাস্টমস কর্মকর্তারা ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমদানি-রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডের তথ্যও যাচাই করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাধিক মাস্টার এলসির বিপরীতে বিপুল কাপড় আমদানি হলেও তার বিপরীতে রপ্তানির কোনো প্রমাণ নেই।

সব মিলিয়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৯ কেজি কাঁচামালের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। কাস্টমসের ভাষ্যমতে, এই বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

জরিমানা ও আইনি পদক্ষেপ

তদন্ত শেষে ‘কাস্টমস আইন ২০২৩’ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বারবার সময় চাওয়া হলেও শুনানিতে কেউ উপস্থিত হয়নি। ফলে কাস্টমস একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।

আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী ৪ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা রাজস্ব পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড। ফলে মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯২ হাজার ১৪১ টাকা।

প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউস আনলকের আবেদন

জরিমানার পরও প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের মে মাসে ওয়্যারহাউস আনলকের আবেদন করে। তাদের দাবি, মিসডিক্লারেশনের কারণে গুদাম সাময়িকভাবে লক হয়েছে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলছে।

তবে কাস্টমস-সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, জরিমানা পরিশোধ না করে এই আবেদন মূলত অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। তাদের অভিযোগ, মালিকপক্ষ ঢাকায় বিভিন্ন মহলে তদবির করছে।

কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতিক্রিয়া

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার মো. সানোয়ারুল কবির জানান, বন্ডের পণ্য খোলাবাজারে সরিয়ে রাজস্বের ক্ষতি করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে আছে বলেও তিনি জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএর এক নেতা মন্তব্য করেন, এত বড় অনিয়ম একা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এতে কাস্টমস বা বিজিএমইএর কিছু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

অন্যদিকে বিজিএমইএর পরিচালক এসএম আবু তৈয়র কাস্টমসের বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত বলেও তিনি মত দেন।

প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য

আর্টিস্টিক অ্যাপারেলসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোজ কান্তি দাশ এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। তবে প্রতিষ্ঠানের অ্যাডমিন ম্যানেজার মোহাম্মদ তানভীর বলেন, বন্ড কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী নোটিশ দিলে প্রতিষ্ঠান তার জবাব দেবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হালাল অর্থনীতি: বাণিজ্যমন্ত্রীর নতুন দিকনির্দেশনা

চট্টগ্রামে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি, জরিমানা ৮.৭৭ কোটি টাকা

আপডেট সময় : ০১:২১:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আর্টিস্টিক অ্যাপারেলস লিমিটেড বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ। এর ফলে সরকার হারিয়েছে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার টাকার বেশি রাজস্ব। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটিকে সব মিলিয়ে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।

নগরের নিউ চাক্তাইয়ের হাজী দেলোয়ার হোসেন সওদাগর মার্কেটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে আসছিল। তবে সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় গত বছরের আগস্টে বন্ড কমিশনারেটের একটি বিশেষ দল কারখানা পরিদর্শনে যায়।

পরিদর্শনে দেখা যায়, গুদামে থাকার কথা ছিল ১ লাখ ৬২ হাজার কেজির বেশি কাঁচামাল। অথচ বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র ১৪ হাজার ৭৮৬ কেজি ফেব্রিক্স। এছাড়া বন্ড রেজিস্টারও গায়েব করে ফেলা হয়েছিল। ফলে প্রতিষ্ঠানের কমার্শিয়াল ম্যানেজার সদ্য কেনা একটি খালি রেজিস্টার দেখান কর্মকর্তাদের।

তদন্তে উঠে এলো ১ লাখ ৪৭ হাজার কেজির গরমিল

কাস্টমস কর্মকর্তারা ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমদানি-রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডের তথ্যও যাচাই করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাধিক মাস্টার এলসির বিপরীতে বিপুল কাপড় আমদানি হলেও তার বিপরীতে রপ্তানির কোনো প্রমাণ নেই।

সব মিলিয়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৯ কেজি কাঁচামালের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। কাস্টমসের ভাষ্যমতে, এই বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

জরিমানা ও আইনি পদক্ষেপ

তদন্ত শেষে ‘কাস্টমস আইন ২০২৩’ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বারবার সময় চাওয়া হলেও শুনানিতে কেউ উপস্থিত হয়নি। ফলে কাস্টমস একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।

আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী ৪ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা রাজস্ব পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড। ফলে মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯২ হাজার ১৪১ টাকা।

প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউস আনলকের আবেদন

জরিমানার পরও প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের মে মাসে ওয়্যারহাউস আনলকের আবেদন করে। তাদের দাবি, মিসডিক্লারেশনের কারণে গুদাম সাময়িকভাবে লক হয়েছে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলছে।

তবে কাস্টমস-সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, জরিমানা পরিশোধ না করে এই আবেদন মূলত অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। তাদের অভিযোগ, মালিকপক্ষ ঢাকায় বিভিন্ন মহলে তদবির করছে।

কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতিক্রিয়া

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার মো. সানোয়ারুল কবির জানান, বন্ডের পণ্য খোলাবাজারে সরিয়ে রাজস্বের ক্ষতি করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে আছে বলেও তিনি জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএর এক নেতা মন্তব্য করেন, এত বড় অনিয়ম একা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এতে কাস্টমস বা বিজিএমইএর কিছু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

অন্যদিকে বিজিএমইএর পরিচালক এসএম আবু তৈয়র কাস্টমসের বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত বলেও তিনি মত দেন।

প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য

আর্টিস্টিক অ্যাপারেলসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোজ কান্তি দাশ এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। তবে প্রতিষ্ঠানের অ্যাডমিন ম্যানেজার মোহাম্মদ তানভীর বলেন, বন্ড কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী নোটিশ দিলে প্রতিষ্ঠান তার জবাব দেবে।