ঢাকা ০২:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ৮ লাখ কোটি টাকার দায়: আর্থিক ঝুঁকিতে সরকার

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ৮ লাখ কোটি টাকার দায়: আর্থিক ঝুঁকিতে সরকার

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বছরের পর বছর ঋণ ও ভর্তুকি দিয়ে এসব সংস্থা টিকিয়ে রাখা হচ্ছে। তবে জনগণের করের টাকা ব্যয় হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসছে না। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মোট দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

প্রায় ৪০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান উচ্চ ও অতি উচ্চ ঝুঁকিতে

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্পর্কিত দায় ৪ লাখ ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। যা মোট দায়ের প্রায় ৪৯ শতাংশ।

১২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯টি অতি উচ্চ এবং ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ শতাংশই চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই অর্থবছরের হালনাগাদ তথ্য যুক্ত হলে মোট দায় ৯ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করবে।

বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে সর্বোচ্চ দায় ও লোকসান

অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় ২ লাখ ২২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) দায় ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা।

এছাড়া ডেসকোর দায় প্রায় ৬১ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা এবং জিটিসিএলের দায় ১৪ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। এই তালিকার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই নিট লোকসানে রয়েছে।

অন্যদিকে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৩০টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে পেট্রোবাংলা, ওয়াসা, বিমান বাংলাদেশ এবং তিতাস গ্যাসের মতো বড় সংস্থাগুলো রয়েছে।

ভর্তুকি ও প্রচ্ছন্ন দায়ের বড় চাপ

২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার সাতটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৬ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত একাই পেয়েছে ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থ।

বিপিডিবি একাই ৩৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা ভর্তুকি নিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে ৯১ হাজার ৪৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

পাশাপাশি ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রচ্ছন্ন দায় রয়েছে ৩৪ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। এই বকেয়া ও আইনি দায় ভবিষ্যতে সরকারের বাজেটে অতিরিক্ত চাপ ফেলবে।

দুর্বল সুশাসন ও নিরীক্ষা সংকট

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট সম্পদের প্রায় ৬৯ শতাংশই ঋণ নির্ভর। প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় ঋণ-ইকুইটি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২৩।

অর্থনৈতিক সুশাসনের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমেছে। ১২২টির মধ্যে ৬৩টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকরা বিরূপ মন্তব্য করেছেন।

অংশীদারিত্ব ও প্রশাসনিক পদগুলোতে রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক নিয়োগের কারণে পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে পরিচালন সক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।

উত্তরণের উপায় ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানান, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানোর পরিকল্পনা চলছে। তবে বিপুল দায় রাতারাতি মেটানো সম্ভব নয়।

সাবেক সিএজি মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চার ভাগে ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো হলো—বেসরকারীকরণ, পিপিপি, জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইজারা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। কারখানার জমি যেন আবাসন খাতে না যায় এবং শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাবনায় মহা সমারোহে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) ও জুশনে জুলুস মাহফিল ২৬ আগস্ট

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ৮ লাখ কোটি টাকার দায়: আর্থিক ঝুঁকিতে সরকার

আপডেট সময় : ১২:৪১:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বছরের পর বছর ঋণ ও ভর্তুকি দিয়ে এসব সংস্থা টিকিয়ে রাখা হচ্ছে। তবে জনগণের করের টাকা ব্যয় হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসছে না। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মোট দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

প্রায় ৪০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান উচ্চ ও অতি উচ্চ ঝুঁকিতে

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্পর্কিত দায় ৪ লাখ ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। যা মোট দায়ের প্রায় ৪৯ শতাংশ।

১২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯টি অতি উচ্চ এবং ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ শতাংশই চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই অর্থবছরের হালনাগাদ তথ্য যুক্ত হলে মোট দায় ৯ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করবে।

বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে সর্বোচ্চ দায় ও লোকসান

অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় ২ লাখ ২২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) দায় ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা।

এছাড়া ডেসকোর দায় প্রায় ৬১ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা এবং জিটিসিএলের দায় ১৪ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। এই তালিকার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই নিট লোকসানে রয়েছে।

অন্যদিকে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৩০টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে পেট্রোবাংলা, ওয়াসা, বিমান বাংলাদেশ এবং তিতাস গ্যাসের মতো বড় সংস্থাগুলো রয়েছে।

ভর্তুকি ও প্রচ্ছন্ন দায়ের বড় চাপ

২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার সাতটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৬ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত একাই পেয়েছে ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থ।

বিপিডিবি একাই ৩৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা ভর্তুকি নিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে ৯১ হাজার ৪৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

পাশাপাশি ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রচ্ছন্ন দায় রয়েছে ৩৪ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। এই বকেয়া ও আইনি দায় ভবিষ্যতে সরকারের বাজেটে অতিরিক্ত চাপ ফেলবে।

দুর্বল সুশাসন ও নিরীক্ষা সংকট

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট সম্পদের প্রায় ৬৯ শতাংশই ঋণ নির্ভর। প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় ঋণ-ইকুইটি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২৩।

অর্থনৈতিক সুশাসনের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমেছে। ১২২টির মধ্যে ৬৩টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকরা বিরূপ মন্তব্য করেছেন।

অংশীদারিত্ব ও প্রশাসনিক পদগুলোতে রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক নিয়োগের কারণে পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে পরিচালন সক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।

উত্তরণের উপায় ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানান, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানোর পরিকল্পনা চলছে। তবে বিপুল দায় রাতারাতি মেটানো সম্ভব নয়।

সাবেক সিএজি মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চার ভাগে ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো হলো—বেসরকারীকরণ, পিপিপি, জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইজারা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। কারখানার জমি যেন আবাসন খাতে না যায় এবং শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।