বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, গত ৩ জুন খানজাহান আলীর দিঘি থেকে মাদি কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেয়া হয়। এরপর বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে ছিল প্রাণীটি। পরে ১২ আগস্ট বিশেষ ব্যবস্থায় কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে নেয়া হয়।
বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.)-এর দিঘির আলোচিত কুমির ‘ধলাপাহাড়’কে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে নেয়া হয়েছে। গত ১২ আগস্ট খুলনার বয়রার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় কুমিরটিকে সেখানে পাঠানো হয়।
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, কুমিরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ থেকে ৮ ফুট। ওজন আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি। ২০০৫ সালে ভারত থেকে আনা কয়েকটি কুমিরের মধ্যে বর্তমানে এটিই একমাত্র জীবিত। অন্যগুলো মারা গেছে।
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, গত ৩ জুন খানজাহান আলীর দিঘি থেকে মাদি কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেয়া হয়। এরপর বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে ছিল প্রাণীটি। পরে ১২ আগস্ট বিশেষ ব্যবস্থায় কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে নেয়া হয়।
বন বিভাগের ওই কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের কেন্দ্রে কোনো বন্য প্রাণী দীর্ঘ সময় রাখা যায় না। তাই কুমিরটিকে বড় আবাসস্থলে সরানোর বিষয়ে ঢাকার বন সংরক্ষক, বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলে চিঠি পাঠানো হয়। পরে একে সাফারি পার্কে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
দিঘি থেকে উদ্ধারের পর কুমিরটি কোনো খাবার খায়নি। বন বিভাগ শুরুতে খাবার দেয়ার চেষ্টা করে। তবে না খেলেও কুমিরটি পুরোপুরি সুস্থ ছিল। এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার কুমির বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয় বন বিভাগ।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বন্দী অবস্থায় কুমির দীর্ঘ সময় না খেলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই এবং জোর করে খাওয়ানোরও প্রয়োজন নেই। কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. জুলকারনাইন পরীক্ষা করে কুমিরটির শারীরিক অবস্থা ভালো পান।
নির্মল কুমার পাল বলেন, নতুন পরিবেশে গিয়ে কিছুদিন খাবার না খাওয়া কুমিরের জন্য স্বাভাবিক। শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী হওয়ায় তাদের শক্তির চাহিদা কম। শরীরে জমা চর্বি থেকেও দীর্ঘ সময় শক্তি পেতে পারে। এমনকি কুমির কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত খাবার ছাড়াও বেঁচে থাকতে পারে। তার ধারণা, পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অপরিচিত ও বন্দী পরিবেশে যাওয়ার কারণেই কুমিরটি এমন আচরণ করেছিল। কক্সবাজারের নতুন পরিবেশে ধীরে ধীরে এটি স্বাভাবিক আচরণ করবে বলে তিনি আশা করছেন।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম জানান, কুমিরটি বর্তমানে ভালো আছে বলে মনে হচ্ছে। পার্কের দিঘিতে সপ্তাহে একদিন খাবার দেয়া হয়। কুমিরটিকে নেয়ার পরদিনই একটি জীবিত মুরগি খেয়েছে। এরপর আর তাকে খাবার খেতে দেখা যায়নি। তবে কুমিরটি সেখানে ভালো থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ১ জুন কুমিরটি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই দিন খানজাহান আলীর মাজারের দিঘিতে গোসল করতে নেমে আট বছর বয়সী এক শিশু কুমিরের আক্রমণে মারা যায়। এর আগে একটি কুকুরকেও কুমিরটি আক্রমণ করে হত্যা করেছিল। এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে জননিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয়দের দাবির মুখে ৩ জুন বন বিভাগ কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রার কেন্দ্রে নিয়ে যায়।
ওই কেন্দ্রের আওতায় সুন্দরবন, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ রয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া বন্য প্রাণী সেখানে রাখা ও চিকিৎসা দেয়া হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, খানজাহান আলীর মাজারসংলগ্ন দিঘিতে শত শত বছর ধরে কুমিরের বসবাস। কথিত আছে, দিঘি খননের পর খানজাহান আলী দুটি কুমির ছাড়েন। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত সতীশ চন্দ্র মিত্রের ইতিহাস গ্রন্থেও ‘কালাপাহাড়’ নামে পুরুষ এবং ‘ধলাপাহাড়’ নামে স্ত্রী কুমিরের কথা উল্লেখ রয়েছে। খানজাহান আলীর মৃত্যুর পরও মাজারের খাদেম ও ভক্তরা কুমির দুটিকে খাবার দিতেন। পরে তারা বংশবিস্তার করে এবং প্রায় সাড়ে ছয়’শ বছর ধরে বংশানুক্রমে দিঘিতে বসবাস করে আসছিল।
তবে খানজাহান আলীর আমলের কুমির ও তাদের বংশধারার শেষ হয় ২০১৫ সালে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে শতবর্ষী পুরুষ ‘ধলাপাহাড়’ মারা যায়। এর আগে ঐতিহ্য ধরে রাখতে ২০০৪ সালের ২৬ জুন ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি মিঠাপানির কুমির এনে দিঘিতে ছাড়া হয়। সেগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ‘ধলাপাহাড়’ই দিঘিতে টিকে ছিল।
এ বছরের জুনে মানুষ ও প্রাণীর ওপর কুমিরটির আক্রমণের পর লোকালয়ের একটি দিঘিতে এভাবে কুমির রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একপর্যায়ে কুমিরটিকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সুন্দরবনের করমজলে কুমির প্রজনন ও পর্যটনকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির দীর্ঘদিন ধরে কুমির নিয়ে কাজ করছেন। তিনি মাজারের কুমিরটির চিকিৎসার জন্য একাধিকবার সেখানে গেছেন। তার মতে, কুমির জন্মগতভাবেই শিকারি ও হিংস্র স্বভাবের। অতিরিক্ত হিংস্র হয়ে ওঠার পেছনে প্রাকৃতিক পরিবেশ, নিজস্ব পরিবেশ রক্ষা এবং মানুষের কার্যকলাপের প্রভাব থাকতে পারে।
আজাদ কবিরের ধারণা, খাবারের অভাব এ ঘটনার কারণ নয়। তার কেন্দ্রে কুমিরকে বেশি খাবার দিয়েও দেখা গেছে, খাবার নিতে তারা দ্রুত এগিয়ে আসে। পরে খাবার না খেয়ে ফেলে রাখে। এটি কুমিরের স্বাভাবিক আচরণের অংশ।
তিনি আরো জানান, মাজারের কুমিরকে শিকার করে খাবার সংগ্রহ করতে হয় না। তাকে খাবার দেয়া হয়। তবে কুমিরের সামনে জীবিত প্রাণী রেখে পরে তা নিয়ে যাওয়ার মতো আচরণের প্রভাব থাকতে পারে। দিঘিতে মাছ ধরতে জাল দেয়াও কুমিরের বিচরণে বাধা তৈরি করে। প্রাণীটি সেখানে একেবারে নিঃসঙ্গ ছিল। এসব কারণও তার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাজারের দিঘিতে ছয়টি কুমিরের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালে মাজারের দুই খাদেম কুমিরের আক্রমণের শিকার হন। পরে দুই দিনে দুটি কুমিরের মরদেহ পাওয়া যায়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের দিকে একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কুমির বড় আরেকটি কুমিরের আক্রমণে মারা যায়। ২০০০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর খাদেমদের জালে পেঁচিয়ে দিঘির সবচেয়ে বড় একটি মাদি কুমির মারা যায়। ২০০৪ সালের ৪ ডিসেম্বর দুটি মাদি কুমিরের মারামারিতে একটি মারা যায়।
কুমিরের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ২০০৪ সালের ২৬ জুন ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি মিঠাপানির কুমির এনে দিঘিতে ছাড়া হয়। ২০০৫ সালের ৫ আগস্ট ওই ছয়টির মধ্যে দুটি পুরুষ কুমিরের আক্রমণে দিঘির একটি পুরুষ কুমির মারা যায়। ২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আরেকটি পুরুষ কুমির মারা যায়। খানজাহান আলীর আমলের কুমিরের শেষ বংশধরটি মারা যায় ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি।
অবমুক্ত করা ছয়টি কুমিরের মধ্যে দুটি মারা যায়। বাকি চারটির মধ্যে দুটি নিজেদের মধ্যে মারামারির পর সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী ও কুমির প্রজননকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। সুস্থ হলে ওই দুটি কুমির সাফারি পার্কে নেয়া হয়। পরে বেঁচে থাকা দুটি কুমিরের মধ্যে পুরুষটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যায়। এরপর দিঘিতে শুধু ‘ধলাপাহাড়’ই টিকে ছিল।




















