দেশে ডিজিটাল অর্থপ্রদানের মাধ্যম হিসেবে কার্ডের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ফলে কার্ড লেনদেনে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে মোট কার্ডভিত্তিক লেনদেন ১০৮ শতাংশ বেড়েছে।
পাঁচ বছরে গ্রাহক ও লেনদেনের প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশের আর্থিক খাতের এই ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২১ সালের আগস্টে দেশে মোট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখের বেশি। তবে চলতি বছরের জুলাই শেষে এই সংখ্যা ৫ কোটি ২৪ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
একই সময়ে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ ২২ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রবৃদ্ধির একটি বড় গতি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে এগিয়ে প্রিপেইড কার্ড
কার্ডের ধরন বিবেচনায় নিলে প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে গত জুলাই পর্যন্ত প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ।
একই সময়ে ডেবিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় লেনদেনে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যাও ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিদেশে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের ব্যবহার
চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশি গ্রাহকেরা বিদেশে কার্ডের মাধ্যমে ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। তবে জুন মাসের তুলনায় এই লেনদেনের হার প্রায় ৫.০৫ শতাংশ কমেছে।
বিদেশে বাংলাদেশি কার্ডধারীরা সবচেয়ে বেশি কেনাকাটা করেছেন বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এ ছাড়া খুচরা দোকান, যাতায়াত, ওষুধ ও পোশাকের দোকানে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে।
শীর্ষে থাকা দেশসমূহ
বিদেশে ক্রেডিট ও ডেবিট—উভয় কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জুলাই মাসে দেশটিতে ক্রেডিট কার্ডে ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়।
তালিকার পরবর্তী স্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং সিঙ্গাপুর। অপরদিকে ডেবিট কার্ড ব্যবহারেও যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৫৩ কোটি ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
বাংলাদেশে থাকা বিদেশিদের কার্ড ব্যবহার
বিদেশি নাগরিকেরা বাংলাদেশে এসে গত জুলাইয়ে প্রায় ২৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এই লেনদেনের বড় অংশই হয়েছে দেশের বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে।
এ ছাড়া নগদ টাকা উত্তোলন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং পোশাক ক্রয়ে তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। বাংলাদেশে কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা। এরপর ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সিঙ্গাপুরের কার্ড ব্যবহার দেখা গেছে।
দেশীয় ক্রেডিট কার্ডের চিত্র ও ব্র্যান্ড
চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি অর্থ খরচ হয়েছে সাধারণ কেনাকাটায়।
ব্র্যান্ডের দিক থেকে চালকের আসনে রয়েছে ‘ভিসা’ কার্ড, যার মাধ্যমে প্রায় ৭৬ শতাংশ লেনদেন সম্পাদিত হয়। তালিকায় এর পরেই রয়েছে মাস্টারকার্ড এবং অ্যামেক্স।
আন্তর্জাতিক প্রবৃদ্ধি ও বকেয়া ঋণ
বিগত এক বছরে দেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৪০.২৪ শতাংশ। একই সময়ে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহারে ৯.৭১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
বর্তমানে দেশে ৪৮টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্ড ঋণ দিচ্ছে। ফলে জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর অনুমোদন দেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা।
সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই রেকর্ড প্রবৃদ্ধি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির গতিকে নির্দেশ করে। বিশেষ করে অনলাইন শপিং, ইউটিলিটি বিল প্রদান এবং ভ্রমণ খাতে কার্ডের সুবিধা সবাই নিচ্ছেন।
তবে অবকাঠামোগত ঘাটতি ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির মতো কিছু বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। তাই সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার ও সচেতনতা বাড়ালে এই খাত আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।





















