ঢাকা ০৬:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থপাচার: সিআইডির হাতে চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

অনলাইন বেটিং ও জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ও ব্যাংক হিসাবে জমা করে পরে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) পাবনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, পাবনা সদর উপজেলার ঈদগাহ রোড বাইলেন এলাকার মো. মনোয়ার হোসেন (৪১), রামচন্দ্রপুরের মো. মারুফ হোসেন হলি (২৭) এবং সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম এলাকার মো. ইলিয়াস হোসেন রাজু (২৬)।

সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে।

সিআইডির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে আতাইকুলা থানার আর/আতাইকুলা ইউনিয়নের বনগ্রাম বাজার এলাকা থেকে ইলিয়াস হোসেন রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে সাঁথিয়া থানার কাশিনাথপুর বাজার এলাকা থেকে মনোয়ার হোসেন ও মারুফ হোসেন হলিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, নিয়মিত সাইবার মনিটরিংয়ের সময় দেশে ও বিদেশে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনলাইন বেটিং ও জুয়া পরিচালনার তথ্য পায় সিআইডি। চক্রটি বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন নামে ওয়েবসাইট খুলে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনও প্রচার করা হতো।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে টাকার বিনিময়ে বেটিং বা জুয়ার আয়োজন করা হতো। এসব সাইটে অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে টাকা জমা বা ‘টপ-আপ’ করতে হতো। এ জন্য বাংলাদেশে ব্যবহৃত বিভিন্ন এমএফএস, ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হতো।

ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট মাধ্যমে টাকা জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেটিং অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ ই-মানি বা বট মানি যুক্ত হতো। এরপর সেই অর্থ ব্যবহার করে অনলাইন জুয়ায় অংশ নিতেন তারা।

সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বেটিং সাইটগুলোতে টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব নিয়মিত পরিবর্তন করা হতো। এজন্য চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে একাধিক এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত।

পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এসব নম্বর ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হতো। এরপর ওই হিসাবগুলো বেটিং সাইটে অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে আসা অর্থ এসব এজেন্টের মাধ্যমে একত্র করা হতো। এজেন্টরা কমিশন রেখে বাকি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করত। পরে এসব অর্থ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পেয়েছে সিআইডি।

এভাবে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে সিআইডি ।

এ ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে গত ১৯ মে পল্টন থানায় মামলা করে। মামলায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

ছুফি উল্লাহ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অনলাইন বেটিং চক্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা এবং জুয়ার টাকা সংগ্রহের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তবে তারা কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছেন, অর্থপাচারের পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং দেশের বাইরে অর্থ পাঠানোর সঙ্গে কারা জড়িত- এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

এছাড়া অনলাইন বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও চক্রের সদস্যদের শনাক্ত, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন ও অর্থপাচারের প্রকৃত পরিমাণ ও পদ্ধতি উদঘাটন এবং অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডি বলছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের অবৈধ লেনদেন, অর্থপাচার এবং এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের ২০২৫ সালের ২৮ মে জারি করা নির্দেশনায় অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এরপরও সংঘবদ্ধ চক্রটি অবৈধ অনলাইন বেটিং ও আর্থিক লেনদেন চালিয়ে আসছিল বলে সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে।

সিআইডি সাধারণ মানুষকে অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন না করার এবং অনলাইন জুয়া বা অর্থপাচার সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা: সাবেক এমপি গাজী নজরুলের জামিন নামঞ্জুর

অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থপাচার: সিআইডির হাতে চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

আপডেট সময় : ০৫:২১:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

অনলাইন বেটিং ও জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ও ব্যাংক হিসাবে জমা করে পরে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) পাবনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, পাবনা সদর উপজেলার ঈদগাহ রোড বাইলেন এলাকার মো. মনোয়ার হোসেন (৪১), রামচন্দ্রপুরের মো. মারুফ হোসেন হলি (২৭) এবং সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম এলাকার মো. ইলিয়াস হোসেন রাজু (২৬)।

সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে।

সিআইডির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে আতাইকুলা থানার আর/আতাইকুলা ইউনিয়নের বনগ্রাম বাজার এলাকা থেকে ইলিয়াস হোসেন রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে সাঁথিয়া থানার কাশিনাথপুর বাজার এলাকা থেকে মনোয়ার হোসেন ও মারুফ হোসেন হলিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, নিয়মিত সাইবার মনিটরিংয়ের সময় দেশে ও বিদেশে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনলাইন বেটিং ও জুয়া পরিচালনার তথ্য পায় সিআইডি। চক্রটি বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন নামে ওয়েবসাইট খুলে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনও প্রচার করা হতো।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে টাকার বিনিময়ে বেটিং বা জুয়ার আয়োজন করা হতো। এসব সাইটে অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে টাকা জমা বা ‘টপ-আপ’ করতে হতো। এ জন্য বাংলাদেশে ব্যবহৃত বিভিন্ন এমএফএস, ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হতো।

ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট মাধ্যমে টাকা জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেটিং অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ ই-মানি বা বট মানি যুক্ত হতো। এরপর সেই অর্থ ব্যবহার করে অনলাইন জুয়ায় অংশ নিতেন তারা।

সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বেটিং সাইটগুলোতে টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব নিয়মিত পরিবর্তন করা হতো। এজন্য চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে একাধিক এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত।

পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এসব নম্বর ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হতো। এরপর ওই হিসাবগুলো বেটিং সাইটে অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে আসা অর্থ এসব এজেন্টের মাধ্যমে একত্র করা হতো। এজেন্টরা কমিশন রেখে বাকি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করত। পরে এসব অর্থ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পেয়েছে সিআইডি।

এভাবে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে সিআইডি ।

এ ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে গত ১৯ মে পল্টন থানায় মামলা করে। মামলায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

ছুফি উল্লাহ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অনলাইন বেটিং চক্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা এবং জুয়ার টাকা সংগ্রহের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তবে তারা কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছেন, অর্থপাচারের পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং দেশের বাইরে অর্থ পাঠানোর সঙ্গে কারা জড়িত- এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

এছাড়া অনলাইন বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও চক্রের সদস্যদের শনাক্ত, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন ও অর্থপাচারের প্রকৃত পরিমাণ ও পদ্ধতি উদঘাটন এবং অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডি বলছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের অবৈধ লেনদেন, অর্থপাচার এবং এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের ২০২৫ সালের ২৮ মে জারি করা নির্দেশনায় অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এরপরও সংঘবদ্ধ চক্রটি অবৈধ অনলাইন বেটিং ও আর্থিক লেনদেন চালিয়ে আসছিল বলে সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে।

সিআইডি সাধারণ মানুষকে অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন না করার এবং অনলাইন জুয়া বা অর্থপাচার সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।