ঢাকা ০৩:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব

রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব



ফটোকার্ড ডাউনলোড

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে পবিত্র রমজানের আগেই ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকেরা। তবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ব্যবসায়ীরা এসব দাবি তুলে ধরেন। আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, সরবরাহ ও বাজারমূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বৈঠকে খেজুর আমদানিকারকেরা জানান, বর্তমানে খেজুর আমদানিতে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ শুল্কায়নমূল্যের কারণে আমদানি খরচ আরও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন করতে হওয়ায় সরবরাহ ব্যয়ও বাড়ছে।

এ ছাড়া ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা অব্যাহত থাকলে রমজানে পণ্য সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।

এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী খেজুরের মান, জাত ও দামের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি জানান, মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি করা হয়। সব ধরনের খেজুরের জন্য একই শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ করা হলে জটিলতা দেখা দিতে পারে।

আমদানিকারকেরা খেজুরের প্রকৃত মূল্য ও মান অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণের দাবি জানান। পাশাপাশি ফল আমদানিতে করব্যবস্থা আরও নমনীয় করার প্রস্তাব দেন তারা। তাদের দাবি, উচ্চ শুল্কের কারণে আমদানি করা ফলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বিদ্যমান শুল্ক সুবিধা কার্যকরের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে।

এ সময়ে দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন। একই সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির জন্য ৮ লাখ ৫ হাজার টনের ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি।

চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি। এ ছাড়া চিনি আমদানির জন্য ৮ লাখ ১০ হাজার টনের ঋণপত্র খোলা হয়েছে।

রমজানের অন্যতম প্রয়োজনীয় পণ্য ছোলার আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৮২ হাজার টন ছোলা আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ১২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার টন। একই সময়ে ছোলা আমদানির জন্য ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের ঋণপত্র খোলা হয়েছে।

অন্যদিকে মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি। মসুর ডাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টনের।

খেজুর আমদানিও বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে ১১ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৪ হাজার টন।

বৈঠকে ডাল ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানে ছোলা ও মসুর ডালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা প্রস্তুত রয়েছেন। তবে বড় ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতার মুখে ছোট ডাল মিলগুলো টিকে থাকতে সমস্যায় পড়ছে।

বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী নেসার উদ্দিন বলেন, রমজানে ছোলা ও মসুর ডালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে বড় ব্যবসায়ীদের কারণে সাধারণ ডাল মিলগুলো ব্যবসা চালাতে পারছে না।

তিনি জানান, দেশে ছোলার চাহিদার পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। আর ডালের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এ অবস্থায় ছোট ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বৈঠকে খেজুর ব্যবসায়ীদের শুল্ক কমানোর দাবির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

অন্যদিকে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সচিব মো. নুরুল ইসলাম মোল্লা কোনো মন্তব্য করেননি।

পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা বৈঠকে জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে ডিম ও মুরগির উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। খামারগুলোতে বড় ধরনের রোগবালাইয়ের প্রকোপ না থাকায় রমজানে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কম।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম কিছুদিন আগেও সাড়ে ১১ টাকা ছিল। বর্তমানে তা কমে ১০ টাকার নিচে নেমেছে, যা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি।

ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাব বাজারমূল্যেও পড়তে পারে।

বর্তমান আমদানি নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া ডিম ও মাংস আমদানির সুযোগ নেই বলেও জানান তারা।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা বেড়েছে। বিপরীতে মসুর ডালের দাম কমেছে।

এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি খরচ এবং দেশের বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়তা হতে পারে।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে তাজা ফলের দাম কিছুটা কমেছে বলেও জানানো হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রমজানে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর, মুরগি ও ডিমের চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে।

বিশেষ করে ইফতারে ছোলা ও খেজুরের ব্যবহার বেড়ে যায়। শরবত, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও বিভিন্ন ইফতারি তৈরিতে চিনির চাহিদাও বাড়ে। রমজানের এক মাসে দেশে চিনির চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টনে পৌঁছায়।

একইভাবে ইফতারে ভাজাপোড়া তৈরির কারণে সয়াবিন ও পাম তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। পেঁয়াজু, বেগুনি, ডালের বড়াসহ বিভিন্ন খাবার তৈরিতে মসুর ডালের চাহিদাও বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মুরগি ও ডিম ছাড়া এসব পণ্যের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে মূলত আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে ডিমও আমদানি করতে হয়। তাই রমজানের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে আগাম আমদানি ও পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা জরুরি।

বৈঠকে ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি এবং বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে সরকার।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, এনবিআর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআই, পুলিশ, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব

আপডেট সময় : ০২:০৫:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


ফটোকার্ড ডাউনলোড

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে পবিত্র রমজানের আগেই ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকেরা। তবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ব্যবসায়ীরা এসব দাবি তুলে ধরেন। আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, সরবরাহ ও বাজারমূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বৈঠকে খেজুর আমদানিকারকেরা জানান, বর্তমানে খেজুর আমদানিতে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ শুল্কায়নমূল্যের কারণে আমদানি খরচ আরও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন করতে হওয়ায় সরবরাহ ব্যয়ও বাড়ছে।

এ ছাড়া ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা অব্যাহত থাকলে রমজানে পণ্য সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।

এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী খেজুরের মান, জাত ও দামের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি জানান, মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি করা হয়। সব ধরনের খেজুরের জন্য একই শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ করা হলে জটিলতা দেখা দিতে পারে।

আমদানিকারকেরা খেজুরের প্রকৃত মূল্য ও মান অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণের দাবি জানান। পাশাপাশি ফল আমদানিতে করব্যবস্থা আরও নমনীয় করার প্রস্তাব দেন তারা। তাদের দাবি, উচ্চ শুল্কের কারণে আমদানি করা ফলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বিদ্যমান শুল্ক সুবিধা কার্যকরের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে।

এ সময়ে দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন। একই সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির জন্য ৮ লাখ ৫ হাজার টনের ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি।

চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি। এ ছাড়া চিনি আমদানির জন্য ৮ লাখ ১০ হাজার টনের ঋণপত্র খোলা হয়েছে।

রমজানের অন্যতম প্রয়োজনীয় পণ্য ছোলার আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৮২ হাজার টন ছোলা আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ১২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার টন। একই সময়ে ছোলা আমদানির জন্য ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের ঋণপত্র খোলা হয়েছে।

অন্যদিকে মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি। মসুর ডাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টনের।

খেজুর আমদানিও বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে ১১ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৪ হাজার টন।

বৈঠকে ডাল ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানে ছোলা ও মসুর ডালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা প্রস্তুত রয়েছেন। তবে বড় ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতার মুখে ছোট ডাল মিলগুলো টিকে থাকতে সমস্যায় পড়ছে।

বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী নেসার উদ্দিন বলেন, রমজানে ছোলা ও মসুর ডালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে বড় ব্যবসায়ীদের কারণে সাধারণ ডাল মিলগুলো ব্যবসা চালাতে পারছে না।

তিনি জানান, দেশে ছোলার চাহিদার পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। আর ডালের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এ অবস্থায় ছোট ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বৈঠকে খেজুর ব্যবসায়ীদের শুল্ক কমানোর দাবির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

অন্যদিকে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সচিব মো. নুরুল ইসলাম মোল্লা কোনো মন্তব্য করেননি।

পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা বৈঠকে জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে ডিম ও মুরগির উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। খামারগুলোতে বড় ধরনের রোগবালাইয়ের প্রকোপ না থাকায় রমজানে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কম।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম কিছুদিন আগেও সাড়ে ১১ টাকা ছিল। বর্তমানে তা কমে ১০ টাকার নিচে নেমেছে, যা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি।

ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাব বাজারমূল্যেও পড়তে পারে।

বর্তমান আমদানি নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া ডিম ও মাংস আমদানির সুযোগ নেই বলেও জানান তারা।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা বেড়েছে। বিপরীতে মসুর ডালের দাম কমেছে।

এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি খরচ এবং দেশের বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়তা হতে পারে।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে তাজা ফলের দাম কিছুটা কমেছে বলেও জানানো হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রমজানে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর, মুরগি ও ডিমের চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে।

বিশেষ করে ইফতারে ছোলা ও খেজুরের ব্যবহার বেড়ে যায়। শরবত, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও বিভিন্ন ইফতারি তৈরিতে চিনির চাহিদাও বাড়ে। রমজানের এক মাসে দেশে চিনির চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টনে পৌঁছায়।

একইভাবে ইফতারে ভাজাপোড়া তৈরির কারণে সয়াবিন ও পাম তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। পেঁয়াজু, বেগুনি, ডালের বড়াসহ বিভিন্ন খাবার তৈরিতে মসুর ডালের চাহিদাও বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মুরগি ও ডিম ছাড়া এসব পণ্যের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে মূলত আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে ডিমও আমদানি করতে হয়। তাই রমজানের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে আগাম আমদানি ও পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা জরুরি।

বৈঠকে ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি এবং বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে সরকার।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, এনবিআর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআই, পুলিশ, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।