ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহতের পর দেশটিতে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থায় কোনো বড় পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে খোদ মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের মধ্যেই তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানে খামেনি নিহত হলেও তেহরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো উপড়ে ফেলা সম্ভব কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা একমত হতে পারছেন না।
ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর আগে থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের পাশাপাশি শাসন ক্ষমতা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। গত রবিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক ভিডিও বার্তায় তিনি ইরানি জনগণকে বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এবং দেশ পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানান।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ১৯৭৯ সাল থেকে চলে আসা এই ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে হটিয়ে দেওয়া দেশটির বর্তমান বিরোধী দলগুলোর জন্য অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র মূল্যায়ন অনুযায়ী, খামেনির শূন্যস্থানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কোনো শীর্ষ নেতা অথবা সমমনা কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইআরজিসি কর্মকর্তারা সহজে আত্মসমর্পণ করবেন না, কারণ তাঁরা একটি বিশাল সুবিধাভোগী নেটওয়ার্কের অংশ।
বিগত সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে আইআরজিসি-র অনড় অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, বাহিনীর ভেতর থেকে বিদ্রোহ বা দলত্যাগের সম্ভাবনা ক্ষীণ। অথচ যেকোনো সফল বিপ্লবের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশের সমর্থন অপরিহার্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
খামেনির মৃত্যু ইরানের পারমাণবিক নীতি বা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে গত জানুয়ারি থেকেই বিতর্ক চলছে। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে যে, নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের আলোচনার ধরনে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে কি না।
এদিকে, ট্রাম্পের ইরান নিয়ে পুনরায় যোগাযোগের ইচ্ছা প্রকাশ করার বিষয়টি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন এখনই বর্তমান সরকারের পতন নিশ্চিত বলে ধরে নিচ্ছে না।
ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, আপাতত একটি তিন সদস্যের ‘পরিচালনা পর্ষদ’ (বিচার বিভাগের প্রধান, গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য ও প্রেসিডেন্ট নিজে) সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, দেশটির নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সামরিক অভিযানের ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায়, যেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা বর্ষণে অন্তত দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বড় অংশই শিশু। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ জনমত ও নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানই নির্ধারণ করবে দেশটির ভবিষ্যৎ।
আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ জোনাথন প্যানিকফ মনে করেন, হামলা পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামলে সাফল্য নির্ভর করবে নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণের ওপর। তারা যদি জনগণের ওপর অস্ত্র ব্যবহার অব্যাহত রাখে, তবে শাসকগোষ্ঠীর অবশিষ্ট অংশ ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হতে পারে।



























