ঢাকা ০৭:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকায় সিএনজি গ্যাস সংকটে ভোগান্তিতে অটোরিকশাচালকেরা

ঢাকায় সিএনজি গ্যাস সংকটে ভোগান্তিতে অটোরিকশাচালকেরা

রাজধানী ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে সিএনজি গ্যাস সংকট। এর ফলে অটোরিকশাচালকেরা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। ফলে তাঁদের আয় কমে যাচ্ছে, আর অনেকে ঋণের বোঝা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর শ্যামলীর একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে যাত্রাবাড়ী থেকে আসা এক চালকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি সকাল সাড়ে আটটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর দুই দফায় তিনি মাত্র ৬০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এমন পরিস্থিতি প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলছে। কখনো কখনো চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

শুধু তিনিই নন, রাজধানীর অসংখ্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের এখন দিনের বড় একটি অংশ কাটছে গ্যাসের জন্য অপেক্ষায়। এর ফলে তাঁদের আয় কমছে, ঋণ বাড়ছে। কারও ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ পরিবারে টাকা পাঠাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।

শ্যামলী থেকে গাবতলী পর্যন্ত পাঁচটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও মধ্যরাত থেকে, আবার কোথাও ভোর থেকে চালকেরা গাড়ি নিয়ে লাইনে অপেক্ষা করছেন। অটোরিকশার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট পিকআপ ভ্যানও লাইনে দেখা গেছে।

ফিলিং স্টেশনের কর্মীরাও একই কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এমনকি চালকেরা বাড়তি টাকা দিয়ে বেশি গ্যাস চাইলেও তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে চালকেরা শুধু সময় নয়, আয়ও হারাচ্ছেন। অথচ গাড়ির মালিককে প্রতিদিনের জমা ঠিকই দিতে হচ্ছে। শ্যামলীর ওই চালক জানান, গত তিন দিনে তাঁর তেমন আয় হয়নি। তবু প্রতিদিন মালিকের জমা দিতেই হবে, নইলে পরদিন গাড়ি পাবেন না।

আগে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় হতো তাঁর। কিন্তু গ্যাস-সংকটে এখন মালিকের জমা দিতেই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তাঁর বাড়ি বরিশালে, সেখানে স্ত্রী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মা থাকেন। আয় কমে যাওয়ায় গত এক মাস ধরে পরিবারকে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারছেন না তিনি।

কল্যাণপুরের একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে উবারচালক একজনের সঙ্গে কথা হয়। বাড্ডা থেকে আসা এই চালক আগের দিন সারা দিন গাড়ি চালিয়ে রাত ১২টায় গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। রাত পেরিয়ে সকাল হলেও গ্যাস পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এর মধ্যে সকাল ১০টার দিকে স্টেশনের মেশিনে সমস্যা দেখা দিলে গ্যাস সরবরাহই বন্ধ হয়ে যায়।

দুপুর ১২টার মধ্যে তাঁর গাড়িতে আর গ্যাস অবশিষ্ট ছিল না। অন্য কোনো স্টেশনে যাওয়ার মতো জ্বালানিও ছিল না। তিনি জানান, গত এক মাস ধরে এভাবেই চলছে। কখনো চার, কখনো পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর গ্যাস মিলছে।

এই চালক জানিয়েছেন, গত ১৫ দিনে বেশির ভাগ রাতেই তিনি বাসায় ফিরতে পারেননি। দিনে গাড়ি চালিয়ে রাতে গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে তাঁকে। কখনো ভোররাতে, কখনো সকালে বাসায় ফিরে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার বের হয়ে পড়েন। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকার গ্যাস নিতেন, এখন কখনো ৩০০, কখনো ৫০০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন মাত্র।

ওই ফিলিং স্টেশনের এক কর্মী জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহে সময় বেশি লাগছে। পাশাপাশি মেশিনে সমস্যা হওয়ায় কিছু সময় সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। মেশিন ঠিক হলে সরবরাহ আবার শুরু হবে বলে তিনি জানান।

গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে চালকদের আয়ে। কারণ গাড়ি যতক্ষণ রাস্তায় চলে, ততক্ষণই আয় হয়। কিন্তু দিনের বড় একটি সময় এখন কেটে যাচ্ছে গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে।

গাবতলীর একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে কুমিল্লার এক চালকের সঙ্গে কথা হয়। ছয় সদস্যের পরিবার তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তিনি জানান, প্রতিদিন গাড়ির মালিককে ১ হাজার ১০০ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাস ও খাবারসহ সব মিলিয়ে প্রতিদিন খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে আগের মতো আয় করতে পারছেন না তিনি।

এ কারণে গ্রামের একটি সমিতি থেকে ১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। প্রতি মাসে বাড়িতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পাঠাতে হয় তাঁকে। তবে গত মাসে তা সম্ভব হয়নি। এমনকি সমিতির ঋণও এই মাসে শোধ করার কথা থাকলেও আয় না বাড়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এই মাসেও নতুন করে ঋণ করতে হবে বলে জানান তিনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকায় সিএনজি গ্যাস সংকটে ভোগান্তিতে অটোরিকশাচালকেরা

আপডেট সময় : ০৫:৩৯:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

রাজধানী ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে সিএনজি গ্যাস সংকট। এর ফলে অটোরিকশাচালকেরা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। ফলে তাঁদের আয় কমে যাচ্ছে, আর অনেকে ঋণের বোঝা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর শ্যামলীর একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে যাত্রাবাড়ী থেকে আসা এক চালকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি সকাল সাড়ে আটটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর দুই দফায় তিনি মাত্র ৬০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এমন পরিস্থিতি প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলছে। কখনো কখনো চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

শুধু তিনিই নন, রাজধানীর অসংখ্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের এখন দিনের বড় একটি অংশ কাটছে গ্যাসের জন্য অপেক্ষায়। এর ফলে তাঁদের আয় কমছে, ঋণ বাড়ছে। কারও ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ পরিবারে টাকা পাঠাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।

শ্যামলী থেকে গাবতলী পর্যন্ত পাঁচটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও মধ্যরাত থেকে, আবার কোথাও ভোর থেকে চালকেরা গাড়ি নিয়ে লাইনে অপেক্ষা করছেন। অটোরিকশার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট পিকআপ ভ্যানও লাইনে দেখা গেছে।

ফিলিং স্টেশনের কর্মীরাও একই কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এমনকি চালকেরা বাড়তি টাকা দিয়ে বেশি গ্যাস চাইলেও তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে চালকেরা শুধু সময় নয়, আয়ও হারাচ্ছেন। অথচ গাড়ির মালিককে প্রতিদিনের জমা ঠিকই দিতে হচ্ছে। শ্যামলীর ওই চালক জানান, গত তিন দিনে তাঁর তেমন আয় হয়নি। তবু প্রতিদিন মালিকের জমা দিতেই হবে, নইলে পরদিন গাড়ি পাবেন না।

আগে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় হতো তাঁর। কিন্তু গ্যাস-সংকটে এখন মালিকের জমা দিতেই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তাঁর বাড়ি বরিশালে, সেখানে স্ত্রী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মা থাকেন। আয় কমে যাওয়ায় গত এক মাস ধরে পরিবারকে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারছেন না তিনি।

কল্যাণপুরের একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে উবারচালক একজনের সঙ্গে কথা হয়। বাড্ডা থেকে আসা এই চালক আগের দিন সারা দিন গাড়ি চালিয়ে রাত ১২টায় গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। রাত পেরিয়ে সকাল হলেও গ্যাস পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এর মধ্যে সকাল ১০টার দিকে স্টেশনের মেশিনে সমস্যা দেখা দিলে গ্যাস সরবরাহই বন্ধ হয়ে যায়।

দুপুর ১২টার মধ্যে তাঁর গাড়িতে আর গ্যাস অবশিষ্ট ছিল না। অন্য কোনো স্টেশনে যাওয়ার মতো জ্বালানিও ছিল না। তিনি জানান, গত এক মাস ধরে এভাবেই চলছে। কখনো চার, কখনো পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর গ্যাস মিলছে।

এই চালক জানিয়েছেন, গত ১৫ দিনে বেশির ভাগ রাতেই তিনি বাসায় ফিরতে পারেননি। দিনে গাড়ি চালিয়ে রাতে গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে তাঁকে। কখনো ভোররাতে, কখনো সকালে বাসায় ফিরে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার বের হয়ে পড়েন। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকার গ্যাস নিতেন, এখন কখনো ৩০০, কখনো ৫০০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন মাত্র।

ওই ফিলিং স্টেশনের এক কর্মী জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহে সময় বেশি লাগছে। পাশাপাশি মেশিনে সমস্যা হওয়ায় কিছু সময় সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। মেশিন ঠিক হলে সরবরাহ আবার শুরু হবে বলে তিনি জানান।

গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে চালকদের আয়ে। কারণ গাড়ি যতক্ষণ রাস্তায় চলে, ততক্ষণই আয় হয়। কিন্তু দিনের বড় একটি সময় এখন কেটে যাচ্ছে গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে।

গাবতলীর একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে কুমিল্লার এক চালকের সঙ্গে কথা হয়। ছয় সদস্যের পরিবার তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তিনি জানান, প্রতিদিন গাড়ির মালিককে ১ হাজার ১০০ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাস ও খাবারসহ সব মিলিয়ে প্রতিদিন খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে আগের মতো আয় করতে পারছেন না তিনি।

এ কারণে গ্রামের একটি সমিতি থেকে ১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। প্রতি মাসে বাড়িতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পাঠাতে হয় তাঁকে। তবে গত মাসে তা সম্ভব হয়নি। এমনকি সমিতির ঋণও এই মাসে শোধ করার কথা থাকলেও আয় না বাড়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এই মাসেও নতুন করে ঋণ করতে হবে বলে জানান তিনি।