কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে দেশের অন্যতম সেরা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বগুড়া। এখানকার হালকা প্রকৌশল শিল্প এখন শুধু দেশের চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং প্রতিবেশী দেশেও পণ্য পাঠাচ্ছে।
স্থানীয় কারখানাগুলোতে তৈরি হচ্ছে রাইস মিলের শেল, সেচ পাম্প, টিউবওয়েল ও ধান-ভুট্টা মাড়াইয়ের যন্ত্র। এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ভারত ও নেপালেও রফতানি হচ্ছে নিয়মিত। ফলে কৃষকদের সময়, শ্রম ও জ্বালানি—তিনটিতেই সাশ্রয় হচ্ছে।
ফুলতলার কারখানায় তৈরি হচ্ছে ২০ ধরনের যন্ত্র
বগুড়ার ফুলতলা এলাকার রনী ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ এ শিল্পের একটি বড় উদাহরণ। এখানে দেশী-বিদেশী প্রযুক্তি মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে অন্তত ২০ ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি। কাজ করছেন ২০ জনের বেশি শ্রমিক।
প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আবু বকর সিদ্দিক রনী জানান, আগে চীন ও ভারত থেকে এসব যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হতো। কিন্তু এখন তারা নিজেরাই এসব উৎপাদন করছেন। প্রতি মাসে তিন থেকে চার টন পণ্য ভারত ও নেপালে পাঠাতে পারছেন তারা।
পিকেএসএফের সহায়তায় আধুনিকায়ন
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এ খাতের উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএফের যৌথ অর্থায়নে চলছে “সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মার্ট)” প্রকল্প। এর বাস্তবায়ন করছে গ্রাম উন্নয়ন কর্ম (গাক)।
এই প্রকল্পের আওতায় উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন ভারী যন্ত্রপাতি কেনার অনুদান। এছাড়া পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সোলার সিস্টেম স্থাপনেও সহায়তা মিলছে। ফলে কর্মপরিবেশ যেমন উন্নত হচ্ছে, তেমনি বিদ্যুৎ খরচও কমছে।
সরকার এগ্রো ইঞ্জিনিয়ারিং এমনই একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে তৈরি হচ্ছে প্রায় ৪০ ধরনের কৃষি যন্ত্র—পাওয়ার ট্রিলার থেকে শুরু করে ঘাস কাটার যন্ত্র পর্যন্ত। স্মার্ট প্রকল্পের আওতায় কারখানায় বসানো হয়েছে ২৫০ ওয়াটের সোলার প্যানেল। এতে মাসে বিদ্যুৎ বিল কমেছে প্রায় ৫ হাজার টাকা।
প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সাইদুজ্জামান সরকার বলেন, স্থানীয়ভাবে যন্ত্র তৈরি হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমেছে। দেশীয় প্রযুক্তি ও সংস্থার অনুদানের কারণে কম দামে বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দেশের ৮০ শতাংশ চাহিদা মেটাচ্ছে বগুড়া
বগুড়া বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় উৎপাদনমুখী কারখানা রয়েছে চার হাজারের বেশি। এর মধ্যে বৃহৎ শিল্প ১২০টি, মাঝারি শিল্প ১৯টি, ক্ষুদ্র শিল্প ২ হাজার ৩৫১টি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প ৭৪৫টি।
দীর্ঘদিন ধরে বগুড়ার ফাউন্ড্রি ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানাগুলো কৃষি যন্ত্র ও মোটরযানের যন্ত্রাংশ তৈরি করে আসছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের কৃষি যন্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ চাহিদাই পূরণ করছেন বগুড়ার উদ্যোক্তারা। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনও বগুড়ার এই খাতকে বিশেষ ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ক্লাস্টারে রয়েছে প্রায় ৭০০টি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ৫০০টি কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন কেন্দ্র এবং ৭৫টি ফাউন্ড্রি।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন
সম্ভাবনার পাশাপাশি সমস্যাও কম নয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বিসিক বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক একেএম মাহফুজুর রহমান বলেন, বিসিকের ইউনিটগুলো চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে পারছে না। কারণ জায়গার সংকট রয়েছে। তবে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
প্রযুক্তি হস্তান্তরে জোর দিচ্ছে স্মার্ট প্রকল্প
পিকেএসএফের স্মার্ট প্রকল্পের সমন্বয়কারী একেএম জহিরুল হক জানান, ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাত এখনো পুরনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না।
এই সমস্যা কাটাতে প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা কয়লাচালিত ফার্নেসের বদলে ইলেকট্রিক ফার্নেস বসিয়েছেন। এছাড়া ম্যানুয়াল মেশিনের পাশাপাশি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সিএনসি মেশিনও ব্যবহার করছেন তারা, যা উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়েছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি অনুসরণকারী উদ্যোক্তাদের অনুদানও দেয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক তাৎপর্য: আমদানি নির্ভরতা কমার সম্ভাবনা
বগুড়ার এই শিল্প শুধু স্থানীয় অর্থনীতি নয়, জাতীয় কৃষি খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আমদানি করা যন্ত্রাংশের বদলে দেশে তৈরি সাশ্রয়ী পণ্য কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগও তৈরি হচ্ছে, কারণ আমদানি বিকল্প যন্ত্র তৈরি হলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমে। রফতানি বাড়লে উল্টো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব। তবে এজন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পর্যাপ্ত শিল্পস্থান তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব চ্যালেঞ্জ কাটাতে পারলে বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস্টার শুধু দেশের চাহিদা মেটানোয় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক বাজারও ধরতে পারবে এই খাত। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, স্থানীয় শিল্পও আরও শক্তিশালী হবে।




















