ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করার প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়েছে, যা ইতিমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাসহ ভারতের একাধিক গণমাধ্যমে এই অভিনব প্রতিবাদের খবরটি গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করা হয়েছে।
গত ১৫ মে (শুক্রবার) ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি যোগমাল্য বাগচীর বেঞ্চে একটি মামলার শুনানি চলাকালীন এই ঘটনা ঘটে। আদালত কক্ষে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, কিছু পরজীবী পুরো ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে।
তিনি চাকরিহীন তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে বলেন:
“এমন কিছু তরুণ রয়েছে যারা কোনো চাকরি পায় না বা পেশাগতভাবে দাঁড়াতে পারে না। পরবর্তীতে তারা মিডিয়া, সামাজিক মাধ্যম, কিংবা আরটিআই (তথ্য অধিকার) কর্মী সেজে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করে।”
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তেই ভারতের ‘জেন-জি’ অর্থাৎ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে ১৬ মে অভিজিৎ দীপকে নামে ৩০ বছর বয়সী এক ডিজিটাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট এক্স (সাবেক টুইটার) ও ইনস্টাগ্রামে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি প্রতীকী ও ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগ বিষয়ে সদ্য স্নাতক পাস করা এই তরুণ বর্তমানে দিনরাত এক করে সামাজিক মাধ্যমে মানুষের বার্তার জবাব দিয়ে যাচ্ছেন।
এই প্রতীকী দলের সদস্য হওয়ার জন্য রসাত্মক কিছু যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেমন— বেকার, অলস, সার্বক্ষণিক অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশে পারদর্শী হওয়া। দলটির নির্বাচনী প্রতীক রাখা হয়েছে ‘মোবাইল ফোন’।
মাত্র চার দিনের মধ্যে এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমের পেজগুলোতে কয়েক লাখ মানুষ যুক্ত হয়েছেন। সাধারণ তরুণদের পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদের মতো মূলধারার রাজনীতিকেরাও এই দলে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে রসাত্মক পোস্ট দিয়েছেন।
দেশব্যাপী তীব্র সমালোচনার মুখে গত শনিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তার বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তিনি ভারতের বেকার যুবসমাজকে নিয়ে কিছু বলেননি।
তার দাবি অনুযায়ী, যারা ‘ভুয়া ও জাল ডিগ্রি’ নিয়ে আইন বা গণমাধ্যমের মতো পেশায় যুক্ত হয়ে ব্যবস্থার ক্ষতি করছে, তাদের উদ্দেশ্য করেই তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন। তিনি আরও যোগ করেন, তরুণ সমাজই উন্নত ভারতের মূল ভিত্তি।
তবে প্রধান বিচারপতির এই ব্যাখ্যার পরও তরুণদের ক্ষোভ কমেনি। বিশ্লেষকদের মতে, ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ কেবল একটি কৌতুক নয়, বরং এটি ভারতের শিক্ষিত তরুণদের দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ। মোদি সরকারের গত ১২ বছরের শাসনামলে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, তীব্র মূল্যস্ফীতি, প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার বিরুদ্ধে এটি যুবসমাজের একটি প্রতীকী প্রতিরোধ।
ব্যঙ্গাত্মক এই দলটির পক্ষ থেকে ৫ দফার একটি ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে কিছু গুরুতর দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
-
অবসর গ্রহণের পর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিদের রাজ্যসভার সদস্য পদ বা কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার দেওয়া যাবে না।
-
দলবদল করা আইনপ্রণেতাদের ২০ বছরের জন্য নির্বাচনে নিষিদ্ধ করতে হবে।
-
সিবিএসই বা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অতিরিক্ত ফি এবং অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।
আন্দোলনের উদ্যোক্তা অভিজিৎ দীপকে বর্তমান শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, “ক্ষমতাসীনরা মনে করেন সাধারণ নাগরিকেরা বুঝি তেলাপোকা বা পরজীবী। তাদের জানা উচিত, পচা জায়গাতেই তেলাপোকার জন্ম হয়। বর্তমান ভারতের শাসনব্যবস্থার অবস্থাও তেমনই।”























