চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের সামরিকভাবে স্বাবলম্বী করার এক তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো এখন কেবল নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই জোরদার করছে না, বরং পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা ও অস্ত্র বিনিময়ের ক্ষেত্রেও নতুন নতুন জোট গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত শনিবার সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ার শীর্ষ নিরাপত্তা সম্মেলনে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। বিশ্ব প্রতিরক্ষা প্রধান, সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই উন্মুক্ত সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর নিরাপত্তার বোঝায় আরও বেশি অংশীদার হওয়ার তাগিদ দেন। তবে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার এশিয়া থেকে দূরে সরে যেতে পারে বলে সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ লক্ষ্য করা যায়।
সম্মেলনের ফাঁকে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষাপ্রধানদের দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে এটি স্পষ্ট, প্রথাগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের একক ছত্রছায়ার ওপর নির্ভর না করে এখন নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই নতুন আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে জাপান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, চীনের বাইরেও একটি ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরিতে টোকিও একটি প্রধান সংযোগকারী বিন্দু হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গত এপ্রিলে জাপান তাদের কয়েক দশকের পুরনো প্রতিরক্ষা রপ্তানিনীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনেছে, যার মাধ্যমে বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আধুনিক অস্ত্র বিক্রির পথ সুগম হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চ্যান চুন সিং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে নমনীয় ও কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, ইচ্ছুক দেশগুলোর এমন জোট নিজেদের সামরিক ঘাটতি পূরণ, নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল পরীক্ষা এবং অজানা কৌশলগত ক্ষেত্রে পথ খুঁজে পেতে সহায়তা করবে।
একইভাবে কানাডার চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল জেনি কারিনিয়ান ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, কানাডীয় বাহিনী বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক মহড়ায় জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে কাজ করছে এবং ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীকে ভাষা ও কারিগরি ক্ষেত্রে সহায়তা দিচ্ছে। এ অঞ্চলে কাজের ব্যাপক পরিধি থাকার কারণেই অংশীদারত্বের এই জোয়ার তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
নিউজিল্যান্ডও তাদের পুরনো হয়ে যাওয়া ‘এএনজেএসি-ক্লাস’ ফ্রিগেটগুলো প্রতিস্থাপন করতে ব্রিটিশ ও জাপানি যুদ্ধজাহাজ কেনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস পেঙ্ক জানান, ৫৪ বছরের পুরনো ‘ফাইভ-পাওয়ার ডিফেন্স অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর অধীনে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে আরও জোরালো ও তীব্র করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।


























