বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরবর্তী অধ্যায় কোথায় লেখা হবে? এই প্রশ্নে সাধারণত ঢাকা, চট্টগ্রাম বা গাজীপুরের কথাই সবার আগে আসে। কিন্তু দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা, বিশেষত নেত্রকোনা জেলা, নীরবে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বহন করছে। আগামী দুই দশকে এই জেলা দেশের অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
হাওরকে আমরা প্রায়ই বন্যা বা জলাবদ্ধতার সঙ্গে জুড়ে দিই। তবে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চিত্রটা ভিন্ন। এখানে কৃষি, মৎস্য, জলসম্পদ, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন ও নবায়নযোগ্য শক্তি একসঙ্গে মিলে একটি সমন্বিত প্রাকৃতিক অর্থনীতি গড়ে তুলেছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, হাওর অঞ্চল দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ সরবরাহ করে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ মাছ উৎপাদনেও এই অঞ্চলের অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগাম বন্যা ও ফ্ল্যাশ ফ্লাড এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নেত্রকোনা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বেশ ইতিবাচক। জেলায় রয়েছে ৬৪টি হাওর এবং ৪৩,৫৬৭ হেক্টরের বেশি হাওর এলাকা। প্রতি বছর এখানে উৎপাদিত হয় ১,০৮,৩৩৮ মেট্রিক টন মাছ। এই খাতে যুক্ত আছেন ৫৩ হাজারের বেশি মৎস্যচাষি এবং ৪৯ হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলে।
জেলার মাছ উৎপাদন স্থানীয় চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে নেত্রকোনা একটি সম্ভাবনাময় কৃষি-খাদ্য রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
হাওর মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, হাওর অঞ্চল জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ২ শতাংশ অবদান রাখে। এর মধ্যে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে নেত্রকোনা শীর্ষস্থানীয় জেলাগুলোর একটি। জাপানের সংস্থা জাইকার একটি গবেষণায়ও উঠে এসেছে, নেত্রকোনার জেলা জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ আসে মৎস্য খাত থেকে। এতে বোঝা যায়, এই জেলার অর্থনৈতিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
তিনটি খাত, একটি অর্থনীতি
কৃষি: নেত্রকোনার অর্থনীতি মূলত বোরো ধানের ওপর দাঁড়িয়ে। তবে কৃষকরা এখনও কাঁচা ধান বিক্রি করেই আয় করেন। আধুনিক রাইস মিলিং, ব্র্যান্ডেড চাল এবং রপ্তানি ব্যবস্থা গড়ে তুললে একই উৎপাদন থেকে বাড়তি মূল্য আদায় সম্ভব।
মৎস্য: শুধু মাছ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড চেইন, হিমায়িত খাদ্য ও হ্যাচারি শিল্প গড়ে তোলা যায়। এর ফলে নেত্রকোনা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্বাদুপানির মৎস্যশিল্প কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
পর্যটন: হাওর, নদী, পাখি ও নৌভ্রমণকে কেন্দ্র করে ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলার সুযোগ আছে। হাওর মাস্টার প্ল্যানেও পর্যটনকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০৩৫ সালের রোডম্যাপ
নেত্রকোনাকে একটি ব্লু-গ্রিন গ্রোথ হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পাঁচটি পদক্ষেপ জরুরি:
- হাওর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা।
- কৃষি ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণে কর প্রণোদনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আনা।
- কোল্ড চেইন ও আধুনিক লজিস্টিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা।
- অ্যাগ্রিটেক, ফিশটেক ও ক্লাইমেটটেক স্টার্টআপে বিশেষ তহবিল গঠন করা।
- ইকো-ট্যুরিজম, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির কর্মসূচি চালু করা।
এছাড়া, ২০২৫-২০৫০ মেয়াদের হালনাগাদ হাওর মাস্টার প্ল্যানে ৯৮টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নৌপথ উন্নয়ন এবং অতিরিক্ত ৭০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। কমিউনিটি-ভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজমও এই পরিকল্পনার অংশ।

বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তর শুধু শিল্পাঞ্চলনির্ভর হবে না। বরং কৃষি, জলসম্পদ, প্রযুক্তি ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে আঞ্চলিক অর্থনীতি গড়ে উঠবে। নেত্রকোনা এই সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
হাওরকে যদি শুধু দুর্যোগের ভূগোল না ভেবে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের অর্থনীতি হিসেবে দেখা যায়, তাহলে নেত্রকোনা আগামী দশকে বাংলাদেশের একটি সফল আঞ্চলিক উন্নয়ন মডেল হয়ে উঠতে পারে।























