কোনো ব্যবসা টানা ১০ বছর ধরে লোকসান করলে সেটাকে কি ব্যর্থ বলা যায়? বেশিরভাগ মানুষ এক কথায় হ্যাঁ বলবেন। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম ব্যবসার হিসাব এত সহজ নয়।
Delivery Hero-এর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে একটি তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে তাদের প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডা প্রায় ১,৫৫০ কোটি টাকা লোকসান করেছে। সংখ্যাটি চোখে পড়ার মতো বড়। তবে একজন ব্যবসা বিশ্লেষকের কাছে সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই লোকসানের প্রকৃতি।
ফুডপান্ডা কোনো সাধারণ রেস্টুরেন্ট নয়। এটি একটি ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস। তাই এর মূল সম্পদ জমি বা ভবন নয়, বরং নেটওয়ার্ক, ডেটা এবং গ্রাহকের আস্থা।
একটি সফল প্ল্যাটফর্মকে একসঙ্গে তিনটি পক্ষ গড়ে তুলতে হয়—গ্রাহক, রেস্টুরেন্ট এবং রাইডার। এই তিন পক্ষ যত বড় হয়, প্ল্যাটফর্মের মূল্যও তত বাড়ে। অর্থনীতিতে একে বলা হয় নেটওয়ার্ক ইফেক্ট।
এই নেটওয়ার্ক রাতারাতি তৈরি হয় না। এর জন্য দরকার হয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং নিয়মিত বিপণন খরচ।
১,৫৫০ কোটি টাকার লোকসান নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ব্যবসাকেই লাভজনক হতে হয়।
তবে শুধু ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এই লোকসানের একটি বড় অংশ এসেছে নতুন বাজার তৈরি এবং গ্রাহকের অভ্যাস বদলানোর খরচ থেকে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও লজিস্টিক সক্ষমতা গড়ে তোলার ব্যয়ও এখানে যুক্ত হয়েছে।
আসল প্রশ্ন হলো—এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত রিটার্ন এনে দেবে কি না।
এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মুনাফা অর্জন
যেকোনো স্টার্টআপের প্রথম অধ্যায় সাধারণত গ্রোথ নিয়ে হয়। কিন্তু দ্বিতীয় অধ্যায়ে অবশ্যই মুনাফা অর্জন করতে হয়।
ফুডপান্ডার জন্য আগামী কয়েক বছর তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটিকে এখন কয়েকটি বিষয় প্রমাণ করতে হবে:
- গ্রাহক আনার খরচ কমানো সম্ভব
- বিদ্যমান গ্রাহক থেকে দীর্ঘমেয়াদি আয় বাড়ানো সম্ভব
- ডেলিভারি কার্যক্রম আরও দক্ষ করা সম্ভব
- ছাড়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়েও অর্ডারের পরিমাণ ধরে রাখা সম্ভব
এই লক্ষ্যগুলো অর্জিত হলে আজকের লোকসান আগামী দিনে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের অনেক স্টার্টআপ শুধু রাজস্ব প্রবৃদ্ধিকেই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি মনে করে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাজস্ব বৃদ্ধি অনেক সময় দৃষ্টিভ্রম তৈরি করতে পারে, আসল বাস্তবতা হলো মুনাফা।
আবার খুব দ্রুত মুনাফার চাপও উদ্ভাবনে বাধা দিতে পারে। তাই উদ্যোক্তাদের গ্রোথ এবং আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
ফুডপান্ডার এই গল্প আসলে একটি কোম্পানির গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির পরিণত হওয়ার গল্প।
এই ঘটনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—নতুন বাজার তৈরিতে বিনিয়োগ, ধৈর্য এবং ঝুঁকি—তিনটিই লাগে। তবে একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয় যে, যেকোনো ব্যবসার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হয় টেকসই মূল্য সৃষ্টি এবং লাভজনকতার ভিত্তিতে।
ফুডপান্ডা বাংলাদেশের ১,৫৫০ কোটি টাকা লোকসানকে শুধু ব্যর্থতার সংখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি একটি ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস গড়ে তোলার বিনিয়োগের অংশও হতে পারে।
তবে এই বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে একটি প্রশ্নের ওপর—বাজারে নেতৃত্বকে ফুডপান্ডা টেকসই মুনাফায় রূপান্তর করতে পারবে কি না। এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ফুডপান্ডার জন্য নয়, বাংলাদেশের পুরো স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।





















