ঢাকা ০১:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭ মাসেই বাতিল অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা, প্রশ্নের মুখে সরকার

৭ মাসেই বাতিল অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা, প্রশ্নের মুখে সরকার

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তালিকাটি ১১৭টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৯৭টি ওষুধে। কিন্তু এর মাত্র সাত মাসের মাথায় সেই তালিকা বাতিল করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। ফলে দেশ আবার ফিরে গেছে ১৯৯৪ সালের পুরোনো ব্যবস্থায়।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ওষুধ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জনস্বার্থের বদলে ওষুধ কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্তে।

গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের প্রস্তাব পাস হয় সেদিন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তালিকা তৈরির সময় এই ধাপ অনুসরণ করেনি। তাই তালিকাটি বাতিল করা হয়েছে বলে সরকারি ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে আপাতত ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত পুরোনো তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাই বহাল থাকবে। পাশাপাশি নতুন করে তালিকা হালনাগাদ করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

৩২ বছরে মাত্র একবার হালনাগাদ

১৯৯৪ সালের নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা ছিল ১১৭টি। এরপর ২০১৬ সালে সামান্য পরিমার্জন হলেও বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি। ২০২৬ সালের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার তালিকাটি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করে ২৯৭টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করে।

নতুন তালিকা তৈরির সময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং নতুন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে তালিকা প্রকাশের পরপরই ওষুধশিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে আপত্তি ওঠে। এমনকি তালিকার বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতেও রিট দায়ের হয়, যা এখনো বিচারাধীন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি পেছনের দিকে হাঁটা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ও জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ড. জাকির আহমেদ চৌধুরী নিজেও তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই সেই তালিকা তৈরি হয়েছিল।

তার মতে, বিশ্বজুড়ে ওষুধের দাম ও পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এমন কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এছাড়া তিনি জানান, গত ২৯ জুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পর আজ পর্যন্ত একটি সভাও হয়নি। তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তেও তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, তালিকা বাতিলের যুক্তি অত্যন্ত ঠুনকো। তার মতে, ত্রুটি থাকলে সংশোধন করাই ছিল যুক্তিসঙ্গত পথ। এভাবে হুট করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফেরায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান সরকার নিজে কি উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করেছে? যদি না করে থাকে, তাহলে তারাও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করেছে।

পুরোনো তালিকায় বাজারে মেলে মাত্র ৩০টি ওষুধ

অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান জানান, ১৯৯৩ সালের তালিকার ১১৭টি ওষুধের মধ্যে বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায় মাত্র ৩০টির মতো। এর সঙ্গে আছে কিছু স্যালাইন ও প্রতিষেধক।

তার মতে, এই পুরোনো তালিকা পুনর্বহাল করা কার্যত পেছনের দিকে হাঁটার শামিল। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসাব্যবস্থায় গত তিন দশকে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাই সময়োপযোগী পুনর্মূল্যায়নই এখন বাস্তবসম্মত পথ বলে মনে করেন তিনি।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেনও একই মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ৩০-৩২ বছর আগের তালিকা দিয়ে বর্তমান জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা বাস্তবে সম্ভব নয়। তালিকার পরিধি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

ভোক্তার পকেটে চাপ বাড়ার আশঙ্কা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সুফিয়ান নাহিন শিমুল বলেন, ওষুধের যৌক্তিক দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সুবিধামতো দাম নির্ধারণ করে থাকে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্যারাসিটামলের সাধারণ রূপ তালিকাভুক্ত থাকলেও কোম্পানিগুলো নতুন সংস্করণের নামে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। রোগীরা বাধ্য হয়েই তা কিনছেন। কড়া তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ওষুধশিল্প সমিতি স্বাগত জানিয়েছে সিদ্ধান্তকে

সব পক্ষ অবশ্য এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেনি। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, আগের সরকার শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা না করেই একতরফাভাবে তালিকা তৈরি করেছিল।

তিনি প্রস্তাব দেন, সরকার চাইলে নিজস্ব বাজেটে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) মাধ্যমে চাহিদা মেটাতে পারে। বেসরকারি খাতের ওপর এই দায় চাপানোর কোনো যুক্তি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নতুন করে গঠিত হলো পাঁচটি কমিটি

গত ১০ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। সিনিয়র সহকারী সচিব রফিকুজ্জামানের সই করা সেই বিজ্ঞপ্তিতে তালিকা ও দাম নির্ধারণ সংক্রান্ত পাঁচটি পৃথক কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

তবে নতুন তালিকা ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় প্রণীত হবে এবং দাম কীভাবে পুনর্নির্ধারিত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নেপথ্য বিশ্লেষণ: স্বাস্থ্যনীতির ধারাবাহিকতা কেন জরুরি

এই ঘটনা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাও সামনে এনেছে। একটি ভালো নীতি প্রণয়নে সময় লাগে, কিন্তু তা বাতিল করতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মাস। এই ধারাবাহিকতার অভাব দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারক উভয়ের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা যত বিস্তৃত হয়, ততই সাধারণ মানুষ কম দামে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার সুযোগ পায়। তালিকা সংকুচিত হলে বাজারে নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা সরাসরি পরিবারের স্বাস্থ্যব্যয়ে চাপ তৈরি করে।

দীর্ঘমেয়াদে সমাধান হতে পারে একটি স্থায়ী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন। এমন একটি সংস্থা প্রতি বছর তালিকা ও মূল্য পর্যালোচনা করতে পারবে বিশেষজ্ঞ, শিল্প প্রতিনিধি ও ভোক্তা—সব পক্ষের মতামত নিয়ে। এতে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের প্রবণতা কমবে এবং সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা বাড়বে।

জনপ্রিয় সংবাদ

৭ মাসেই বাতিল অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা, প্রশ্নের মুখে সরকার

আপডেট সময় : ১২:৩১:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তালিকাটি ১১৭টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৯৭টি ওষুধে। কিন্তু এর মাত্র সাত মাসের মাথায় সেই তালিকা বাতিল করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। ফলে দেশ আবার ফিরে গেছে ১৯৯৪ সালের পুরোনো ব্যবস্থায়।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ওষুধ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জনস্বার্থের বদলে ওষুধ কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্তে।

গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের প্রস্তাব পাস হয় সেদিন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তালিকা তৈরির সময় এই ধাপ অনুসরণ করেনি। তাই তালিকাটি বাতিল করা হয়েছে বলে সরকারি ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে আপাতত ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত পুরোনো তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাই বহাল থাকবে। পাশাপাশি নতুন করে তালিকা হালনাগাদ করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

৩২ বছরে মাত্র একবার হালনাগাদ

১৯৯৪ সালের নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা ছিল ১১৭টি। এরপর ২০১৬ সালে সামান্য পরিমার্জন হলেও বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি। ২০২৬ সালের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার তালিকাটি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করে ২৯৭টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করে।

নতুন তালিকা তৈরির সময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং নতুন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে তালিকা প্রকাশের পরপরই ওষুধশিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে আপত্তি ওঠে। এমনকি তালিকার বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতেও রিট দায়ের হয়, যা এখনো বিচারাধীন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি পেছনের দিকে হাঁটা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ও জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ড. জাকির আহমেদ চৌধুরী নিজেও তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই সেই তালিকা তৈরি হয়েছিল।

তার মতে, বিশ্বজুড়ে ওষুধের দাম ও পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এমন কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এছাড়া তিনি জানান, গত ২৯ জুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পর আজ পর্যন্ত একটি সভাও হয়নি। তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তেও তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, তালিকা বাতিলের যুক্তি অত্যন্ত ঠুনকো। তার মতে, ত্রুটি থাকলে সংশোধন করাই ছিল যুক্তিসঙ্গত পথ। এভাবে হুট করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফেরায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান সরকার নিজে কি উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করেছে? যদি না করে থাকে, তাহলে তারাও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করেছে।

পুরোনো তালিকায় বাজারে মেলে মাত্র ৩০টি ওষুধ

অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান জানান, ১৯৯৩ সালের তালিকার ১১৭টি ওষুধের মধ্যে বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায় মাত্র ৩০টির মতো। এর সঙ্গে আছে কিছু স্যালাইন ও প্রতিষেধক।

তার মতে, এই পুরোনো তালিকা পুনর্বহাল করা কার্যত পেছনের দিকে হাঁটার শামিল। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসাব্যবস্থায় গত তিন দশকে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাই সময়োপযোগী পুনর্মূল্যায়নই এখন বাস্তবসম্মত পথ বলে মনে করেন তিনি।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেনও একই মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ৩০-৩২ বছর আগের তালিকা দিয়ে বর্তমান জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা বাস্তবে সম্ভব নয়। তালিকার পরিধি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

ভোক্তার পকেটে চাপ বাড়ার আশঙ্কা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সুফিয়ান নাহিন শিমুল বলেন, ওষুধের যৌক্তিক দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সুবিধামতো দাম নির্ধারণ করে থাকে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্যারাসিটামলের সাধারণ রূপ তালিকাভুক্ত থাকলেও কোম্পানিগুলো নতুন সংস্করণের নামে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। রোগীরা বাধ্য হয়েই তা কিনছেন। কড়া তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ওষুধশিল্প সমিতি স্বাগত জানিয়েছে সিদ্ধান্তকে

সব পক্ষ অবশ্য এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেনি। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, আগের সরকার শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা না করেই একতরফাভাবে তালিকা তৈরি করেছিল।

তিনি প্রস্তাব দেন, সরকার চাইলে নিজস্ব বাজেটে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) মাধ্যমে চাহিদা মেটাতে পারে। বেসরকারি খাতের ওপর এই দায় চাপানোর কোনো যুক্তি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নতুন করে গঠিত হলো পাঁচটি কমিটি

গত ১০ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। সিনিয়র সহকারী সচিব রফিকুজ্জামানের সই করা সেই বিজ্ঞপ্তিতে তালিকা ও দাম নির্ধারণ সংক্রান্ত পাঁচটি পৃথক কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

তবে নতুন তালিকা ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় প্রণীত হবে এবং দাম কীভাবে পুনর্নির্ধারিত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নেপথ্য বিশ্লেষণ: স্বাস্থ্যনীতির ধারাবাহিকতা কেন জরুরি

এই ঘটনা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাও সামনে এনেছে। একটি ভালো নীতি প্রণয়নে সময় লাগে, কিন্তু তা বাতিল করতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মাস। এই ধারাবাহিকতার অভাব দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারক উভয়ের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা যত বিস্তৃত হয়, ততই সাধারণ মানুষ কম দামে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার সুযোগ পায়। তালিকা সংকুচিত হলে বাজারে নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা সরাসরি পরিবারের স্বাস্থ্যব্যয়ে চাপ তৈরি করে।

দীর্ঘমেয়াদে সমাধান হতে পারে একটি স্থায়ী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন। এমন একটি সংস্থা প্রতি বছর তালিকা ও মূল্য পর্যালোচনা করতে পারবে বিশেষজ্ঞ, শিল্প প্রতিনিধি ও ভোক্তা—সব পক্ষের মতামত নিয়ে। এতে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের প্রবণতা কমবে এবং সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা বাড়বে।