সময় আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক একটা বিষয় মনে হয়। সকাল হয়, রাত নামে, বছর ঘুরে যায়। কিন্তু সময়ের রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, ঘণ্টা, সপ্তাহ বা টাইম জোনের কোনোটিই প্রকৃতির নিয়ম নয়। এগুলো সম্পূর্ণ মানুষের তৈরি ব্যবস্থা। আর তাই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি, ধর্ম, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা।
মানুষ বহু আগে থেকেই সূর্য, চাঁদ ও ঋতুচক্র দেখে সময় নির্ধারণ করে আসছে। তবে সব সমাজ একই পদ্ধতি অনুসরণ করেনি। কোথাও সৌর পঞ্জিকা প্রধান হয়েছে, কোথাও আবার চান্দ্র পঞ্জিকা। এমনকি সপ্তাহের দৈর্ঘ্যও সব জায়গায় সাত দিনের ছিল না।
আজ বিশ্বজুড়ে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার সবচেয়ে বেশি চালু থাকলেও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কারণে ভিন্ন পঞ্জিকাও টিকে আছে। বাংলাদেশেও এর প্রমাণ মেলে। এখানে রাষ্ট্রীয় কাজে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি চলে, কিন্তু ধর্মীয় আচারে হিজরি সন এবং সামাজিক জীবনে বাংলা সন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়।
বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এলিজাবেথ কোহেন মনে করেন, সময়ের প্রতিটি পরিমাপই মূলত মানুষের সিদ্ধান্তের ফল, কোনো প্রাকৃতিক বাধ্যবাধকতা নয়। তবু চাকরির সাক্ষাৎকার থেকে শুরু করে আদালতের সময়সীমা পর্যন্ত সবকিছুতেই এই নির্ধারিত সময় বাস্তব নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়।
শিল্পবিপ্লব যেভাবে ঘড়িকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানাল
কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষের কাজ প্রকৃতির সংকেতে চলত। তবে অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। কারখানায় নির্দিষ্ট শিফট ও হাজিরার প্রয়োজন দেখা দেয়, ফলে ঘড়ি হয়ে ওঠে শ্রম নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র।
ইতিহাসবিদ মাইকেল ও’ম্যালির মতে, শিল্পায়নের একটি বড় লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে নিয়মিত সময়বোধ গড়ে তোলা। আজও এর প্রভাব স্পষ্ট। অফিসের সময়, ওভারটাইম আর ডেলিভারির ডেডলাইন সবকিছুই সময়কে শৃঙ্খলার উপকরণে পরিণত করেছে। এর ওপর স্মার্টফোন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ফলে কর্মঘণ্টা শেষ হলেও ‘সবসময় অনলাইনে থাকা’র চাপ তৈরি হয়েছে।
রেলপথ বিস্তারের আগে প্রতিটি শহরের সময় ছিল আলাদা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রে ৪০টিরও বেশি স্থানীয় সময়মান চালু ছিল। এতে ট্রেনের সময়সূচি মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ১৮৮৩ সালের ১৮ নভেম্বর মার্কিন রেল কোম্পানিগুলো নিজেরাই দেশকে চারটি টাইম জোনে ভাগ করে দেয়।
এরপর ১৮৮৪ সালের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গ্রিনিচকে প্রাইম মেরিডিয়ানের ভিত্তি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। নৃতত্ত্ববিদ কেভিন বার্থ অবশ্য মনে করেন, গ্রিনিচের কোনো বিশেষ ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল না। বরং তখনকার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বৈশ্বিক প্রভাবই এই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছিল।
তাত্ত্বিকভাবে প্রতিটি টাইম জোনের ব্যবধান ১৫ ডিগ্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেশের সীমান্ত, প্রশাসনিক সুবিধা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে এই সীমানা বাঁকানো ও অসমান হয়ে পড়ে।
চীন পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত হলেও দেশটিতে সরকারিভাবে একটিই টাইম জোন চালু আছে। ১৯৪৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এই ব্যবস্থা চালু করে। ফলে পশ্চিমাঞ্চলে সূর্যোদয় দেরিতে হলেও আনুষ্ঠানিক সময় বেইজিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে হয়।
অন্যদিকে ডে-লাইট সেভিং টাইম নিয়েও বিতর্ক থামছে না। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ বছরে দুইবার ঘড়ি পরিবর্তন করে। সমর্থকেরা বলেন, এতে জ্বালানি সাশ্রয় হয়। তবে সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তন ঘুম ও শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটায়।
সময় শুধু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম নয়, প্রতিরোধেরও অস্ত্র হতে পারে। সরকার কারফিউ দিয়ে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আবার শ্রমিকেরা ধর্মঘট বা কর্মবিরতির মাধ্যমে সময়কেই প্রতিরোধের হাতিয়ার বানাতে পারেন। রাজনৈতিক আন্দোলনেও সমাবেশের সময় বা অবরোধের মেয়াদ আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণ করে।
পরিশেষে বলা যায়, সময় নিছক ঘড়ির কাঁটার চলাচল নয়। এটি মানুষকে সংগঠিত করে, রাষ্ট্র পরিচালনা সহজ করে, আবার একই সঙ্গে মানুষকে নিয়ন্ত্রণও করে। তাই সময়ের প্রতিটি হিসাবের পেছনেই লুকিয়ে থাকে ক্ষমতার এক নীরব রাজনীতি।

























