ঢাকা ১১:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি

অনলাইন ডেস্ক: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। সারাদেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি হলেও রাজধানী ঢাকাতেই অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজারের বেশি।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর এক নোটিশের জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠলেও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব যান বাড়ায় বিদ্যুৎ ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। এসব যান চার্জ দিতে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার কারণে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক সংযোগ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার এবং ট্রান্সফরমারে অতিরিক্ত লোড দেওয়ায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকিও বাড়ছে।

সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর দাবি, প্রতিদিন অটোরিকশা চার্জ দিতে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার কারণে এর বিপরীতে সরকারের রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে যেখানে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি, সেখানে শুধু ঢাকাতেই অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ৪৮ হাজারের বেশি। এসব স্থানে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

তবে অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রেহানা আক্তার রানু। বিকল্প ব্যবস্থা না করে এসব যান জব্দ বা চালকদের হয়রানি না করার পরামর্শ দেন তিনি।

সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হন। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংশ্লিষ্টতা ছিল।

অনিবন্ধিত যানবাহন, চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, দুর্বল ব্রেকিং ব্যবস্থা ও আলোর স্বল্পতার কারণে এসব যান দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়কে ধীরগতির অটোরিকশা চলাচলও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার ফলে সিসা দূষণসহ মাটি ও পানির দূষণ বাড়ছে।

এর প্রভাবে শিশু শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও পোলট্রি খাতও ক্ষতির মুখে পড়ছে। নতুন নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রাজধানীর যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকার ১৭টি সিগন্যালে ৫০টি এআই ক্যামেরা চালু রয়েছে।

এর পাশাপাশি রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোকে এই প্রযুক্তির আওতায় আনা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনতে নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় অনুমোদিত অটোরিকশায় নম্বর প্লেট ও কিউআর কোড রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। একই নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক গাড়ি চালানো ঠেকাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা ভাবা হচ্ছে।

সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু অটোরিকশার জন্য সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং ব্যবস্থা চালু, বিআরটিএর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং অঞ্চলভিত্তিক চলাচলের প্রস্তাব দেন।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল মানুষের কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি বিবেচনায় রেখেই পরিবেশ সুরক্ষা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিরোধীদলীয় নেতাকে দেড়শ টাকার দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর

অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি

আপডেট সময় : ১০:৩৮:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। সারাদেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি হলেও রাজধানী ঢাকাতেই অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজারের বেশি।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর এক নোটিশের জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠলেও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব যান বাড়ায় বিদ্যুৎ ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। এসব যান চার্জ দিতে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার কারণে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক সংযোগ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার এবং ট্রান্সফরমারে অতিরিক্ত লোড দেওয়ায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকিও বাড়ছে।

সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর দাবি, প্রতিদিন অটোরিকশা চার্জ দিতে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার কারণে এর বিপরীতে সরকারের রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে যেখানে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি, সেখানে শুধু ঢাকাতেই অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ৪৮ হাজারের বেশি। এসব স্থানে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

তবে অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রেহানা আক্তার রানু। বিকল্প ব্যবস্থা না করে এসব যান জব্দ বা চালকদের হয়রানি না করার পরামর্শ দেন তিনি।

সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হন। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংশ্লিষ্টতা ছিল।

অনিবন্ধিত যানবাহন, চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, দুর্বল ব্রেকিং ব্যবস্থা ও আলোর স্বল্পতার কারণে এসব যান দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়কে ধীরগতির অটোরিকশা চলাচলও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার ফলে সিসা দূষণসহ মাটি ও পানির দূষণ বাড়ছে।

এর প্রভাবে শিশু শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও পোলট্রি খাতও ক্ষতির মুখে পড়ছে। নতুন নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রাজধানীর যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকার ১৭টি সিগন্যালে ৫০টি এআই ক্যামেরা চালু রয়েছে।

এর পাশাপাশি রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোকে এই প্রযুক্তির আওতায় আনা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনতে নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় অনুমোদিত অটোরিকশায় নম্বর প্লেট ও কিউআর কোড রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। একই নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক গাড়ি চালানো ঠেকাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা ভাবা হচ্ছে।

সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু অটোরিকশার জন্য সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং ব্যবস্থা চালু, বিআরটিএর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং অঞ্চলভিত্তিক চলাচলের প্রস্তাব দেন।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল মানুষের কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি বিবেচনায় রেখেই পরিবেশ সুরক্ষা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।