দেশে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নতুন বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। এর মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেল। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিপুল খেলাপি ঋণ ও আন্তর্জাতিক ঋণমান নিয়ে উদ্বেগকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশে নতুন বিদেশি মূলধন এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
এর আগে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছিল ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ফলে পরপর দুই প্রান্তিকে নতুন বিনিয়োগ কমার ঘটনা দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ঋণমানকে বিশেষ গুরুত্ব দেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ঋণমান কয়েক দফা কমায় নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পাশাপাশি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার ও আর্থিক দুর্বলতাও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে উঠছে।
তবে নতুন মূলধন প্রবাহ কমলেও এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, আলোচ্য প্রান্তিকে নিট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, বছরভিত্তিক হিসাবে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।
মূলত দেশে আগে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফার একটি অংশ পুনর্বিনিয়োগ করায় মোট বিনিয়োগ বেড়েছে। তবে আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ শতাংশ।
বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা করে যে মুনাফা অর্জন করে, তার একটি অংশ দেশে রেখে আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে সেটিকে পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা হিসেবে গণনা করা হয়। এ ধরনের বিনিয়োগ মোট এফডিআই বাড়ালেও তা নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীর আগমনের নির্দেশক নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বেড়ে ২৬ কোটি ৯১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, আলোচ্য প্রান্তিকে মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ খাতে মোট ৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেশে এসেছে। বিপরীতে এ খাত থেকে ৪০ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার বাইরে চলে গেছে। ফলে এ খাতে নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারে।
এদিকে বিদেশি বিনিয়োগের তিনটি প্রধান উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট ঋণ এসেছে মাত্র ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এর পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
সেই হিসাবে এক প্রান্তিকের ব্যবধানে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ কমেছে ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর গত বছরের একই সময়ের ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ডলারের তুলনায় পতনের হার ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।
আলোচ্য সময়ে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ হিসেবে মোট ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার দেশে এলেও বিপরীতে ৩২ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার বাইরে চলে গেছে। ফলে নিট বিদেশি বিনিয়োগে এ খাতের অবদান ছিল খুবই সীমিত।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে আসে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম হার ১০ শতাংশ।
রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ব্যাংক খাতের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক ঋণমান নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বাংলাদেশ।
তবে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর সর্বশেষ মূল্যায়নে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস স্থিতিশীল করেছে।
অন্যদিকে, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি+’ অপরিবর্তিত রাখলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস নেতিবাচক রেখেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক খাতের সংকট ও বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত থাকলে নতুন বিদেশি মূলধন আকর্ষণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়াতে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



























