ঢাকা ০২:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারি বেতন মেটাতে বিশেষ ঋণ, বাড়ছে সরকারের আর্থিক চাপ

সরকারি বেতন মেটাতে বিশেষ ঋণ, বাড়ছে সরকারের আর্থিক চাপ



ফটোকার্ড ডাউনলোড

নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করবে সরকার। অক্টোবরের বেতনের পাশাপাশি আগের তিন মাসের বকেয়া অর্থও দেওয়া হবে একই দিনে। এ অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ জোগাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়িয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে বুধবার (২৮ অক্টোবর) ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলামের মাধ্যমে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সাধারণত ব্যাংক খাত থেকে ঋণ সংগ্রহে সরকার ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করে থাকে। তবে রাজস্ব আয় ও নিয়মিত ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে স্বল্প সময়ের জন্য ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ছাড়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের বিল ইস্যুর প্রয়োজন না হলেও এবার সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন পরিশোধের জন্য বিশেষ নিলাম আয়োজন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান আগামী রোববার নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন দেওয়ার কারণে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এ চাহিদা পূরণ করতেই ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসে মঙ্গলবার পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সরকার। নতুন নিলামে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হলে মাসটিতে মোট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো এক মাসে এত বেশি ঋণ সংগ্রহের নজির নেই।

এর আগে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। আগস্টে এ পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

তবে এসব নিলামের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থের পুরোটাই সরকারের নতুন বা নিট ঋণ নয়। কারণ উত্তোলিত অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ আগের বিল ও বন্ডের মেয়াদ শেষে দায় পরিশোধ কিংবা পুনরায় ইস্যুর কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে প্রকৃত নিট ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে অক্টোবরে নতুন ঋণের তথ্য পাওয়া গেলেও এ সময়ে আগের কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাতে পারেননি।

এদিকে সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গত ৫ অক্টোবরের নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড বা বিনিয়োগের বিপরীতে আয় ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবরের নিলামে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে অন্যান্য মেয়াদের বিল ও বন্ডের ইল্ডও বেড়েছে।

ব্যাংক খাতে বিপুল উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার মধ্যেই সরকারি ঋণের সুদহার বাড়ছে। আগস্ট শেষে দেশের ব্যাংকগুলোয় উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। এ অর্থের একটি অংশ বিনিয়োগ ছাড়াই পড়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সরকারের অর্থের চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই নিয়মিত নিলামের পাশাপাশি বিশেষ ট্রেজারি বিল ও অতিরিক্ত বন্ড ইস্যু করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থের সংস্থান করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। প্রত্যাশিত রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, প্রচলিত বিল ও বন্ডের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ইস্যুর বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার লক্ষ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা হলে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের ঘোষিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এতে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে এ ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু দেশের ব্যাংক খাত থেকেই ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকার রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। যদিও সংশোধিত বাজেটে এ খাতে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কারণে চলতি অর্থবছরে ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজস্ব আহরণে ঘাটতিও সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়িয়ে তুলছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জুলাই ও আগস্টেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হয়নি। ফলে নিয়মিত ব্যয় নির্বাহে ব্যাংকঋণের প্রয়োজন বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অক্টোবরের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের চারটি নিলামে ২০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সংখ্যক নিলামে ১৮২ দিন মেয়াদি বিল থেকে এসেছে ১২ হাজার কোটি টাকা। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ সময়ে শুধু ট্রেজারি বিল থেকেই ৪০ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেছে সরকার।

এ ছাড়া ২ থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে আরও ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। মঙ্গলবার ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। উভয় বন্ডের ইল্ড ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

এদিকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দিতে স্বল্পমেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যুর সিদ্ধান্তকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তার মতে, সরকারের রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। অথচ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় প্রকল্প গ্রহণ অব্যাহত থাকায় ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাবে বেসরকারি খাতের অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।

অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ঋণ গ্রহণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার এখন নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধের চক্রে পড়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি মেয়াদ শেষ হওয়া ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দায় পরিশোধের পরিবর্তে সেগুলো পুনরায় নবায়ন করতে হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর বাইরে পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু বেতন বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।

নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী, সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বেতন ও ভাতার নতুন কাঠামো পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হবে।

নবম বেতন কাঠামো সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারি বেতন মেটাতে বিশেষ ঋণ, বাড়ছে সরকারের আর্থিক চাপ

আপডেট সময় : ১২:১৯:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬


ফটোকার্ড ডাউনলোড

নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করবে সরকার। অক্টোবরের বেতনের পাশাপাশি আগের তিন মাসের বকেয়া অর্থও দেওয়া হবে একই দিনে। এ অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ জোগাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়িয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে বুধবার (২৮ অক্টোবর) ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলামের মাধ্যমে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সাধারণত ব্যাংক খাত থেকে ঋণ সংগ্রহে সরকার ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করে থাকে। তবে রাজস্ব আয় ও নিয়মিত ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে স্বল্প সময়ের জন্য ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ছাড়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের বিল ইস্যুর প্রয়োজন না হলেও এবার সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন পরিশোধের জন্য বিশেষ নিলাম আয়োজন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান আগামী রোববার নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন দেওয়ার কারণে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এ চাহিদা পূরণ করতেই ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসে মঙ্গলবার পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সরকার। নতুন নিলামে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হলে মাসটিতে মোট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো এক মাসে এত বেশি ঋণ সংগ্রহের নজির নেই।

এর আগে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। আগস্টে এ পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

তবে এসব নিলামের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থের পুরোটাই সরকারের নতুন বা নিট ঋণ নয়। কারণ উত্তোলিত অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ আগের বিল ও বন্ডের মেয়াদ শেষে দায় পরিশোধ কিংবা পুনরায় ইস্যুর কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে প্রকৃত নিট ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে অক্টোবরে নতুন ঋণের তথ্য পাওয়া গেলেও এ সময়ে আগের কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাতে পারেননি।

এদিকে সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গত ৫ অক্টোবরের নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড বা বিনিয়োগের বিপরীতে আয় ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবরের নিলামে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে অন্যান্য মেয়াদের বিল ও বন্ডের ইল্ডও বেড়েছে।

ব্যাংক খাতে বিপুল উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার মধ্যেই সরকারি ঋণের সুদহার বাড়ছে। আগস্ট শেষে দেশের ব্যাংকগুলোয় উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। এ অর্থের একটি অংশ বিনিয়োগ ছাড়াই পড়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সরকারের অর্থের চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই নিয়মিত নিলামের পাশাপাশি বিশেষ ট্রেজারি বিল ও অতিরিক্ত বন্ড ইস্যু করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থের সংস্থান করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। প্রত্যাশিত রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, প্রচলিত বিল ও বন্ডের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ইস্যুর বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার লক্ষ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা হলে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের ঘোষিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এতে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে এ ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু দেশের ব্যাংক খাত থেকেই ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকার রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। যদিও সংশোধিত বাজেটে এ খাতে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কারণে চলতি অর্থবছরে ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজস্ব আহরণে ঘাটতিও সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়িয়ে তুলছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জুলাই ও আগস্টেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হয়নি। ফলে নিয়মিত ব্যয় নির্বাহে ব্যাংকঋণের প্রয়োজন বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অক্টোবরের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের চারটি নিলামে ২০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সংখ্যক নিলামে ১৮২ দিন মেয়াদি বিল থেকে এসেছে ১২ হাজার কোটি টাকা। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ সময়ে শুধু ট্রেজারি বিল থেকেই ৪০ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেছে সরকার।

এ ছাড়া ২ থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে আরও ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। মঙ্গলবার ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। উভয় বন্ডের ইল্ড ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

এদিকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দিতে স্বল্পমেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যুর সিদ্ধান্তকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তার মতে, সরকারের রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। অথচ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় প্রকল্প গ্রহণ অব্যাহত থাকায় ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাবে বেসরকারি খাতের অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।

অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ঋণ গ্রহণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার এখন নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধের চক্রে পড়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি মেয়াদ শেষ হওয়া ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দায় পরিশোধের পরিবর্তে সেগুলো পুনরায় নবায়ন করতে হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর বাইরে পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু বেতন বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।

নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী, সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বেতন ও ভাতার নতুন কাঠামো পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হবে।

নবম বেতন কাঠামো সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।