গ্রামীণফোনের সাবেক শ্রমিক-কর্মচারীদের ২০১০–২০১২ সালের ওয়ার্কার্স পার্টিসিপেশন ফান্ড (WPPF) ও ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ড (WWF)-সংক্রান্ত ৫ শতাংশ বিলম্বজনিত পাওনা পরিশোধের দাবিতে রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ‘ফ্যামিলি ডে ২০২৬’ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। শনিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও পারিবারিক সংহতি কর্মসূচির আয়োজন করে গ্রামীণফোন ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ।
সংগঠনটির দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কর্মসূচিতে সাবেক শ্রমিক-কর্মচারীদের পাশাপাশি তাঁদের জীবনসঙ্গী, সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের অংশগ্রহণের কথা ছিল। এতে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ জনের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে পাওনা নিষ্পত্তি না হওয়ায় পরিবারগুলোর ওপর তৈরি হওয়া আর্থিক ও মানসিক চাপ এবং সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরাই ছিল কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।
সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
ঐক্য পরিষদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পাওনা অনিষ্পন্ন থাকায় এর প্রভাব শুধু সাবেক কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নেই; তাঁদের পুরো পরিবারও আর্থিক ও মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে। সংসারের দৈনন্দিন ব্যয়, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
‘ফ্যামিলি ডে ২০২৬’ কর্মসূচিতে পরিবারের সদস্য ও সন্তানেরা তাঁদের অভিজ্ঞতা, উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা তাঁদের বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন পাওনার বিষয়টি উল্লেখ করে দ্রুত, ন্যায্য ও আইনসম্মত নিষ্পত্তির দাবি জানান।
সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, পাওনার হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কর্মী ও তাঁদের পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতিকেও সমাধানের আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষায় তাঁদের সন্তানদের শৈশব পেরিয়ে গেছে, শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়েছে এবং পরিবারের প্রয়োজনও বদলে গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রভাব সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর পড়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।
সন্তানদের নিরাপদ, স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা নিয়ে পরিবারগুলো কর্মসূচিতে অংশ নেয়। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
প্রায় ২৩ মাসের আন্দোলনেও সমাধান হয়নি, দাবি সংগঠনের
ঐক্য পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০–২০১২ সালের সংশ্লিষ্ট পাওনা নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন রয়েছে। এ দাবিতে ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে ধারাবাহিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে সংগঠনটি। সেই আন্দোলনের প্রায় ২৩ মাস হতে চললেও কার্যকর নিষ্পত্তি হয়নি বলে দাবি করেছে পরিষদ।
সংগঠনটি জানায়, এ সময়ের মধ্যে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, স্মারকলিপি প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার জন্য বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে তাদের অভিযোগ, এসব উদ্যোগের পরও বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।
ঐক্য পরিষদের বক্তব্য, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে আলোচনার নির্দিষ্ট তারিখ, স্বচ্ছভাবে হিসাব যাচাইয়ের ব্যবস্থা এবং নিষ্পত্তির বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
পাওনা নিষ্পত্তি দেখে যেতে পারেননি সাত সহকর্মী
দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও আন্দোলনের মধ্যে তাঁদের সাতজন সহকর্মী মারা গেছেন বলে জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির দাবি, তাঁরা জীবদ্দশায় নিজেদের দাবিকৃত পাওনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি দেখে যেতে পারেননি।
পরিষদের ভাষ্য, প্রয়াত সহকর্মীদের পরিবারের কাছে এই দীর্ঘ অপেক্ষা এখন স্বজন হারানোর বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তাই বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় প্রয়াত কর্মীদের পরিবার ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাঁদের উত্তরাধিকারীদের দাবিও যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিটিআরসির পরামর্শের পরবর্তী পদক্ষেপ জানতে চায় ঐক্য পরিষদ
ঐক্য পরিষদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংগঠনটির ২০২৬ সালের ২৯ জুলাইয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) লিগ্যাল শাখা ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ককে একটি চিঠি পাঠায়।
পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই চিঠিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে একাধিক মামলা চলমান থাকার কথা উল্লেখ করে আদালতের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে উভয় পক্ষের সম্মতি এবং আদালতের প্রয়োজনীয় অনুমতি বা নির্দেশনা সাপেক্ষে আরবিট্রেশন কিংবা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
এই পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কী পদক্ষেপ নিয়েছে, আলোচনার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নির্ধারণ করা হয়েছে কি না এবং ADR প্রক্রিয়ার বিষয়ে তাদের অবস্থান কী—তা লিখিতভাবে জানানোর দাবি জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ।
গ্রামীণফোন ও গ্রামীণ টেলিকমের কার্যকর ভূমিকা দাবি
ঐক্য পরিষদের অভিযোগ, বারবার আবেদন ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের পরও গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ এবং গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারহোল্ডার গ্রামীণ টেলিকমের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সমন্বিত ও দৃশ্যমান নিষ্পত্তির উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সংগঠনটি গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদের কাছে এ বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত, বিদ্যমান বাধা এবং পরবর্তী করণীয় প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা এবং গ্রহণযোগ্য সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছে।
পরিষদের বক্তব্য, দায়িত্বশীল প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার প্রতিফলন ঘটাতে হলে কর্মীদের বক্তব্য শুনতে হবে, প্রাসঙ্গিক নথি ও হিসাব যাচাইয়ে সহযোগিতা করতে হবে এবং আইনসম্মত নিষ্পত্তির সুযোগ অনুসন্ধানে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকারি দপ্তরে দেওয়া স্মারকলিপির অগ্রগতি প্রকাশের আহ্বান
ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, শ্রম মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সংশ্লিষ্ট দাবি নিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজ নিজ এখতিয়ারে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন এবং তার ফলাফল কী—তা লিখিতভাবে জানানোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
পাশাপাশি দাবিকৃত পাওনা এবং সম্ভাব্য সরকারি রাজস্বের বিষয়ে উপস্থাপিত হিসাব সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রযোজ্য বিধানের ভিত্তিতে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে পরিষদ। সংগঠনটির মতে, স্বচ্ছ ও যৌথভাবে যাচাইযোগ্য হিসাব বিরোধের প্রকৃত পরিসর নির্ধারণ এবং গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তির কাঠামো তৈরিতে সহায়ক হবে।
ঐক্য পরিষদের সাত দফা দাবি
গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীদের পাওনা নিষ্পত্তির জন্য সাত দফা দাবি জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ। দাবিগুলো হলো—
১. ২০১০–২০১২ সালের WPPF ও WWF-সংক্রান্ত ৫ শতাংশ বিলম্বজনিত পাওনার দ্রুত, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
২. বিটিআরসির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত পদক্ষেপ এবং ADR বা আরবিট্রেশনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান প্রকাশ করতে হবে।
৩. আলোচনার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় বিচারিক অনুমতি সাপেক্ষে আলোচনার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে।
৪. মূল অর্থ পরিশোধের সময়কাল, বিলম্বের মেয়াদ, দাবিকৃত পাওনা এবং সম্ভাব্য সরকারি রাজস্বের হিসাব সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।
৫. প্রয়াত সাত সহকর্মীর পরিবারের দাবিসহ সংশ্লিষ্ট সব দাবিদারের বিষয় নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৬. সরকারি দপ্তরে জমা দেওয়া স্মারকলিপির বিষয়ে গৃহীত ব্যবস্থা ও বর্তমান অগ্রগতি লিখিতভাবে জানাতে হবে।
৭. সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদ ও কর্তৃপক্ষকে নিষ্পত্তির কর্মপরিকল্পনা এবং অগ্রগতি জানানোর সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করতে হবে।
ন্যায্য ও সম্মানজনক সমাধানের আহ্বান
ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, তারা আদালত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। প্রযোজ্য আইন ও সংশ্লিষ্ট আদেশ অনুসরণ করে ন্যায্য ও সম্মানজনক সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
পরিবার ও সন্তানদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই কর্মসূচি থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি মানবিক বিবেচনা ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কর্মসূচিতে উপস্থিত থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও সন্তানদের বক্তব্য শুনে তাঁদের অভিজ্ঞতা স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরার অনুরোধও জানায় পরিষদ।
সংগঠনটি কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও আইনানুগভাবে পরিচালনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
ঐক্য পরিষদের আহ্বান—১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পরিবারের মর্যাদা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে আলোচনার তারিখ, নিষ্পত্তির সময়সূচি এবং বাস্তব অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে।
১৬ বছরের পাওনা আদায়ের দাবিতে সংসদ ভবনের সামনে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীদের ‘ফ্যামিলি ডে’
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় : ০৫:৩০:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- 12
জনপ্রিয় সংবাদ

























