ঢাকা ০৪:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে অপরাধ বৃদ্ধি: ৬ মাসে খুন বেড়েছে ১২.২ শতাংশ

দেশে অপরাধ বৃদ্ধি: ৬ মাসে খুন বেড়েছে ১২.২ শতাংশ

দেশে চুরি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এছাড়া অনলাইন জুয়া ও পারিবারিক নৃশংসতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে পাড়া-মহল্লা থেকে সর্বত্র নিরাপত্তাহীনতা স্পষ্ট হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু নানা কারণে দেশে অপরাধ বৃদ্ধি থামানো যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক সূচকে উদ্বেগজনক চিত্র

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে সব সূচকই এখন ঊর্ধ্বমুখী। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাঁচটি প্রধান কারণে দেশে অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে নামবিও-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় অপরাধে আফগানিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। এই তালিকায় বাংলাদেশের স্কোর এখন ৬১.৬ পয়েন্ট।

অর্থনৈতিক মন্দা ও জীবনযাত্রার চাপ

গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট অপরাধের বড় কারণ। নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দামে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। ফলে বৈধ আয়ে সংসার চালানো কঠিন হচ্ছে।

একই সঙ্গে দেশে কর্মসংস্থানের অভাব তীব্র হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে। তাই দ্রুত টাকা আয়ের আশায় অনেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

মাদকের বিস্তার ও কিশোর গ্যাং

পাড়া-মহল্লায় আধুনিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ক্ষতিকর মাদক ছড়িয়ে পড়ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে আসক্তরা মারাত্মক অপরাধ করছে। ফলে পরিবারেও সহিংসতা বাড়ছে।

পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তার করতে তৈরি হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের অন্যায় কাজে ব্যবহার করছে। ফলে এলাকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়

বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ও আইনের শিথিল প্রয়োগের কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া হচ্ছে। একটি অপরাধের রায় আসতে বছরের পর বছর কেটে যায়। ফলে আসামিরা সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে যায়।

প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক মহলের আশ্রয়ে অপরাধীরা রক্ষা পাচ্ছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ফলে বিচারহীনতার সুযোগে অপরাধ আরও বাড়ছে।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয়

ব্যস্ততা ও যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় সন্তানদের সঙ্গে মা-বাবার দূরত্ব বাড়ছে। এতে অভিভাবকের তদারকি কমে যাচ্ছে। ইন্টারনেটে অপসংস্কৃতি ও পর্নোগ্রাফি তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার মোহে সাইবার অপরাধ বাড়ছে। এছাড়া অনলাইন জুয়া ও সহিংস গেম তরুণদের অপরাধে উৎসাহিত করছে।

সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভ

ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করছে। এক শ্রেণির মানুষের কালো টাকার দালিলিক প্রদর্শন অন্যদের হতাশ করছে।

এর ফলে অনেক তরুণ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছে। দেশে বিচারহীনতার কারণে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।

পুলিশের হালনাগাদ পরিসংখ্যান

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৭৭৮টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,৫৮৫টি। ফলে এক বছরে খুন বেড়েছে ১২.২ শতাংশ।

ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি ৪১১টি খুনের মামলা হয়েছে। এ বছরের এপ্রিলে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা হয়েছে ২,০১১টি। মার্চ মাসের তুলনায় এটি ৩৫.৪ শতাংশ বেশি।

২০২৫ সালে দেশে চুরি ১২ শতাংশ ও ছিনতাই ৩৭ শতাংশ বেড়েছিল। তাছাড়া অপহরণের ঘটনা বেড়েছিল ৭১ শতাংশ। চলতি বছরেও এই চিত্র পরিবর্তন হয়নি।

পরিস্থিতি উত্তরণের উপায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল বলপ্রয়োগ করে এটি কমানো যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা।

প্রথমত, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা বাড়াতে হবে। তবেই এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশে অপরাধ বৃদ্ধি: ৬ মাসে খুন বেড়েছে ১২.২ শতাংশ

আপডেট সময় : ১২:৪৮:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশে চুরি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এছাড়া অনলাইন জুয়া ও পারিবারিক নৃশংসতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে পাড়া-মহল্লা থেকে সর্বত্র নিরাপত্তাহীনতা স্পষ্ট হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু নানা কারণে দেশে অপরাধ বৃদ্ধি থামানো যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক সূচকে উদ্বেগজনক চিত্র

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে সব সূচকই এখন ঊর্ধ্বমুখী। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাঁচটি প্রধান কারণে দেশে অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে নামবিও-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় অপরাধে আফগানিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। এই তালিকায় বাংলাদেশের স্কোর এখন ৬১.৬ পয়েন্ট।

অর্থনৈতিক মন্দা ও জীবনযাত্রার চাপ

গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট অপরাধের বড় কারণ। নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দামে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। ফলে বৈধ আয়ে সংসার চালানো কঠিন হচ্ছে।

একই সঙ্গে দেশে কর্মসংস্থানের অভাব তীব্র হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে। তাই দ্রুত টাকা আয়ের আশায় অনেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

মাদকের বিস্তার ও কিশোর গ্যাং

পাড়া-মহল্লায় আধুনিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ক্ষতিকর মাদক ছড়িয়ে পড়ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে আসক্তরা মারাত্মক অপরাধ করছে। ফলে পরিবারেও সহিংসতা বাড়ছে।

পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তার করতে তৈরি হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের অন্যায় কাজে ব্যবহার করছে। ফলে এলাকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়

বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ও আইনের শিথিল প্রয়োগের কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া হচ্ছে। একটি অপরাধের রায় আসতে বছরের পর বছর কেটে যায়। ফলে আসামিরা সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে যায়।

প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক মহলের আশ্রয়ে অপরাধীরা রক্ষা পাচ্ছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ফলে বিচারহীনতার সুযোগে অপরাধ আরও বাড়ছে।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয়

ব্যস্ততা ও যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় সন্তানদের সঙ্গে মা-বাবার দূরত্ব বাড়ছে। এতে অভিভাবকের তদারকি কমে যাচ্ছে। ইন্টারনেটে অপসংস্কৃতি ও পর্নোগ্রাফি তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার মোহে সাইবার অপরাধ বাড়ছে। এছাড়া অনলাইন জুয়া ও সহিংস গেম তরুণদের অপরাধে উৎসাহিত করছে।

সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভ

ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করছে। এক শ্রেণির মানুষের কালো টাকার দালিলিক প্রদর্শন অন্যদের হতাশ করছে।

এর ফলে অনেক তরুণ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছে। দেশে বিচারহীনতার কারণে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।

পুলিশের হালনাগাদ পরিসংখ্যান

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৭৭৮টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,৫৮৫টি। ফলে এক বছরে খুন বেড়েছে ১২.২ শতাংশ।

ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি ৪১১টি খুনের মামলা হয়েছে। এ বছরের এপ্রিলে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা হয়েছে ২,০১১টি। মার্চ মাসের তুলনায় এটি ৩৫.৪ শতাংশ বেশি।

২০২৫ সালে দেশে চুরি ১২ শতাংশ ও ছিনতাই ৩৭ শতাংশ বেড়েছিল। তাছাড়া অপহরণের ঘটনা বেড়েছিল ৭১ শতাংশ। চলতি বছরেও এই চিত্র পরিবর্তন হয়নি।

পরিস্থিতি উত্তরণের উপায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল বলপ্রয়োগ করে এটি কমানো যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা।

প্রথমত, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা বাড়াতে হবে। তবেই এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।