ঢাকা ০৪:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনা, বাণিজ্য-ভিসা সহজ করার তাগিদ

বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনা, বাণিজ্য-ভিসা সহজ করার তাগিদ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা আরও বাড়াতে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন গতি দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা, স্বাভাবিক বাণিজ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারে দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ভৌগোলিক অবস্থান পারস্পরিক সহযোগিতার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব।

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতির আকার বড় হলেও নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো গেলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ তুলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আলোচনা প্রয়োজন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বৈঠকে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ভিসা জটিলতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে নিয়মিত যাতায়াতকারীদের কয়েক মাস পরপর নতুন করে ভিসার আবেদন করা বাস্তবসম্মত নয়। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ব্যবস্থার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে দুটি যৌথ কর্মদল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই। এর একটি অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করবে। অন্যটি অর্ধপরিবাহী, পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন, ব্যাটারি সংরক্ষণ ও তথ্যকেন্দ্রের মতো ভবিষ্যৎমুখী শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করবে।

সিআইআই প্রতিনিধিরা জানান, ভারতে গত বছর অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ হয়েছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে বলে তারা মনে করেন।

বৈঠকে স্থানীয় উৎপাদনশীল শিল্পের সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নানা সমস্যার কারণে বাংলাদেশের অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ও কমানো সম্ভব।

এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরে সিআইআইয়ের এক প্রতিনিধি বলেন, দেশে উৎপাদনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আনতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। স্থানীয় শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ভোগ্যপণ্য খাতেও বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিআইআই। ঢাকার আশপাশে সাবান, গৃহস্থালি পোকানাশক ও সুগন্ধিসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের জন্য একটি আধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের আগ্রহের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রতিনিধিরা।

শিল্পকারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে শুল্ক কাঠামো সমন্বয়ের আহ্বানও জানিয়েছে সিআইআই। প্রতিনিধিরা জানান, তাদের বাষ্প-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে বস্ত্র, তৈরি পোশাক ও খাদ্যশিল্পে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে শুল্কের বৈষম্যের কারণে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষানবিশির সুযোগ তৈরি এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় দেশে কাজের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা কমাতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই।

বৈঠকে উভয় পক্ষই শুধু আনুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ, ব্যবসায়ী পর্যায়ের যোগাযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

এনবিআর ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হচ্ছে: অর্থমন্ত্রী

বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনা, বাণিজ্য-ভিসা সহজ করার তাগিদ

আপডেট সময় : ০৩:০২:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা আরও বাড়াতে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন গতি দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা, স্বাভাবিক বাণিজ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারে দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ভৌগোলিক অবস্থান পারস্পরিক সহযোগিতার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব।

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতির আকার বড় হলেও নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো গেলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ তুলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আলোচনা প্রয়োজন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বৈঠকে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ভিসা জটিলতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে নিয়মিত যাতায়াতকারীদের কয়েক মাস পরপর নতুন করে ভিসার আবেদন করা বাস্তবসম্মত নয়। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ব্যবস্থার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে দুটি যৌথ কর্মদল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই। এর একটি অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করবে। অন্যটি অর্ধপরিবাহী, পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন, ব্যাটারি সংরক্ষণ ও তথ্যকেন্দ্রের মতো ভবিষ্যৎমুখী শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করবে।

সিআইআই প্রতিনিধিরা জানান, ভারতে গত বছর অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ হয়েছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে বলে তারা মনে করেন।

বৈঠকে স্থানীয় উৎপাদনশীল শিল্পের সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নানা সমস্যার কারণে বাংলাদেশের অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ও কমানো সম্ভব।

এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরে সিআইআইয়ের এক প্রতিনিধি বলেন, দেশে উৎপাদনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আনতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। স্থানীয় শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ভোগ্যপণ্য খাতেও বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিআইআই। ঢাকার আশপাশে সাবান, গৃহস্থালি পোকানাশক ও সুগন্ধিসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের জন্য একটি আধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের আগ্রহের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রতিনিধিরা।

শিল্পকারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে শুল্ক কাঠামো সমন্বয়ের আহ্বানও জানিয়েছে সিআইআই। প্রতিনিধিরা জানান, তাদের বাষ্প-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে বস্ত্র, তৈরি পোশাক ও খাদ্যশিল্পে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে শুল্কের বৈষম্যের কারণে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষানবিশির সুযোগ তৈরি এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় দেশে কাজের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা কমাতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই।

বৈঠকে উভয় পক্ষই শুধু আনুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ, ব্যবসায়ী পর্যায়ের যোগাযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার ওপর গুরুত্ব দেয়।