ঢাকা ০৮:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, বৈধ ৩৪৩টি ভোটের মধ্যে অলি আহমদ বীর বিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট।

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন তিনি। তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। বিপরীতে রাষ্ট্রপতি পদের আরেক প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-র চেয়ারম্যান অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য।

এর আগে এদিন দুপুরে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটের নির্দেশিকা তুলে ধরেন। এরপর শুরু হয় ভোটগ্রহণ। প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ভোট দেন। তারা ভোট দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ সংসদ সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী ও প্রার্থীর সঙ্গেও করমর্দন করেন। প্রায় ৮ মিনিট সংসদ কক্ষে অবস্থানের পর তিনি সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।

দুপুর ২টা ১০ মিনিটে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী নিজের আসন থেকে উঠে পাশে বসা বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সঙ্গে নিয়ে ভোট বাক্সের কাছে যান। ২টা ১১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ব্যালট পেপার নিয়ে ভোট বাক্সের কাছে যান এবং নিজের ব্যালট পেপার বাক্সে ফেলেন।

এ সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। এরপর ভোট বাক্সে ব্যালট পেপার ফেলেন রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে তিনি উপস্থিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে করমর্দন করেন। এ সময় বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের কাছে গিয়েও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি।

দুপুর ২টা ১২ মিনিটে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান ভোট দেন। এরপর একে একে ভোট দেন অন্য সংসদ সদস্যরা। বিকাল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হয় ভোটগণনা।

গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি বলেন, মোট ভোটার ৩৪৯ জন। ভোটগ্রহণের জন্য মোট ৩৪৯টি ব্যালট পেপার ছিল। এর মধ্যে ৩৪৩টি ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়েছে এবং ছয়টি অব্যবহৃত রয়েছে। ব্যবহৃত ৩৪৩টি ব্যালট পেপারই বৈধ হিসেবে গণ্য হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ব্যালট পেপার ভুল-ত্রুটি থাকায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ১৯৯১ সালের বিধিমালার ১০ নম্বর বিধি অনুযায়ী এই ব্যালট পেপারগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়।

তিনি আরো বলেন, বৈধ ৩৪৩টি ভোটের মধ্যে অলি আহমদ বীর বিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ী এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন পেশায় আইনজীবী ছিলেন। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের দুইবারের সদস্য এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ছিলেন। এরশাদ সরকারের আমলে তিনি মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তার মা মির্জা ফাতেমা আমিন।

ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ার সময় তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার পর মির্জা ফখরুল অধ্যাপনা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতার পর তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন।

১৯৮৮ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। ৯০-এর দশকের শুরুতে এরশাদ বিরোধী দেশব্যাপী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন।

দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে তিনি বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহ-সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে দীর্ঘদিন সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে জয়লাভ করেন তিনি। তবে, দেশজুড়ে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও সংকটময় সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম দলের অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্বে আসেন। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে চলে যান। এ পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুল ইসলামই দেশে থেকে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম ও আন্দোলনের মূল কাণ্ডারী হয়ে ওঠেন।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রিয়ারির নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তার আসনটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঠিক পাশেই। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, দলের চরম সংকটে দীর্ঘদিনের ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে সম্মানিত করা হচ্ছে।

ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম পারিবারিক জীবনকেন্দ্রিক এক ব্যক্তিত্ব। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই কন্যা মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তার পরিবার। তার স্ত্রী বেসরকারি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বর্তমানে তিনি অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তার বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এবং সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

ছাত্রনেতা ও শিক্ষক থেকে শুরু করে তৃণমূলের রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়ায় আইন অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিত্ব সরকারি দুটি পদই শূন্য হলো। ফলে তার নির্বাচনী আসনও শূন্য ঘোষণা করা হবে, একই সঙ্গে এলজিআরডিমন্ত্রী পদে কে আসবেন, তা নিয়েও চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা-কল্পনা।

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্গাপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বৃক্ষরোপণ

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

আপডেট সময় : ০৬:৫২:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, বৈধ ৩৪৩টি ভোটের মধ্যে অলি আহমদ বীর বিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট।

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন তিনি। তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। বিপরীতে রাষ্ট্রপতি পদের আরেক প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-র চেয়ারম্যান অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য।

এর আগে এদিন দুপুরে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটের নির্দেশিকা তুলে ধরেন। এরপর শুরু হয় ভোটগ্রহণ। প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ভোট দেন। তারা ভোট দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ সংসদ সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী ও প্রার্থীর সঙ্গেও করমর্দন করেন। প্রায় ৮ মিনিট সংসদ কক্ষে অবস্থানের পর তিনি সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।

দুপুর ২টা ১০ মিনিটে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী নিজের আসন থেকে উঠে পাশে বসা বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সঙ্গে নিয়ে ভোট বাক্সের কাছে যান। ২টা ১১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ব্যালট পেপার নিয়ে ভোট বাক্সের কাছে যান এবং নিজের ব্যালট পেপার বাক্সে ফেলেন।

এ সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। এরপর ভোট বাক্সে ব্যালট পেপার ফেলেন রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে তিনি উপস্থিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে করমর্দন করেন। এ সময় বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের কাছে গিয়েও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি।

দুপুর ২টা ১২ মিনিটে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান ভোট দেন। এরপর একে একে ভোট দেন অন্য সংসদ সদস্যরা। বিকাল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হয় ভোটগণনা।

গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি বলেন, মোট ভোটার ৩৪৯ জন। ভোটগ্রহণের জন্য মোট ৩৪৯টি ব্যালট পেপার ছিল। এর মধ্যে ৩৪৩টি ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়েছে এবং ছয়টি অব্যবহৃত রয়েছে। ব্যবহৃত ৩৪৩টি ব্যালট পেপারই বৈধ হিসেবে গণ্য হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ব্যালট পেপার ভুল-ত্রুটি থাকায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ১৯৯১ সালের বিধিমালার ১০ নম্বর বিধি অনুযায়ী এই ব্যালট পেপারগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়।

তিনি আরো বলেন, বৈধ ৩৪৩টি ভোটের মধ্যে অলি আহমদ বীর বিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ী এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন পেশায় আইনজীবী ছিলেন। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের দুইবারের সদস্য এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ছিলেন। এরশাদ সরকারের আমলে তিনি মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তার মা মির্জা ফাতেমা আমিন।

ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ার সময় তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার পর মির্জা ফখরুল অধ্যাপনা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতার পর তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন।

১৯৮৮ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। ৯০-এর দশকের শুরুতে এরশাদ বিরোধী দেশব্যাপী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন।

দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে তিনি বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহ-সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে দীর্ঘদিন সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে জয়লাভ করেন তিনি। তবে, দেশজুড়ে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও সংকটময় সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম দলের অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্বে আসেন। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে চলে যান। এ পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুল ইসলামই দেশে থেকে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম ও আন্দোলনের মূল কাণ্ডারী হয়ে ওঠেন।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রিয়ারির নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তার আসনটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঠিক পাশেই। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, দলের চরম সংকটে দীর্ঘদিনের ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে সম্মানিত করা হচ্ছে।

ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম পারিবারিক জীবনকেন্দ্রিক এক ব্যক্তিত্ব। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই কন্যা মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তার পরিবার। তার স্ত্রী বেসরকারি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বর্তমানে তিনি অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তার বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এবং সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

ছাত্রনেতা ও শিক্ষক থেকে শুরু করে তৃণমূলের রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়ায় আইন অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিত্ব সরকারি দুটি পদই শূন্য হলো। ফলে তার নির্বাচনী আসনও শূন্য ঘোষণা করা হবে, একই সঙ্গে এলজিআরডিমন্ত্রী পদে কে আসবেন, তা নিয়েও চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা-কল্পনা।