কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলা বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিরোধ তীব্র রূপ নিয়েছে। উপজেলা কমিটির নির্দেশ অমান্য করে গঠনতন্ত্র পরিপন্থী উপায়ে পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগে তৃণমূলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্কের তীর সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল গফুর ভূঁইয়ার দিকে। দলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পুনর্বাসিত করার অভিযোগে স্থানীয় রাজনীতি এখন চরম উত্তপ্ত।
এই বিতর্কের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ঢুলোয়া ইউনিয়নের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন। সম্প্রতি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আশিকুর রহমান মাহমুদসহ জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এই ইউনিয়নের নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। কিন্তু পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত না করেই নতুন কমিটি ঘোষণার খবরে সাধারণ নেতা-কর্মীদের মাঝে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, গঠনতন্ত্র তোয়াক্কা না করে গত ১২ ও ১৩ আগস্ট উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে তড়িঘড়ি করে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চালানো হয়। এতে মনোনয়নপত্র বিক্রি ও প্রত্যাহারের জন্য নির্ধারিত সময় দেওয়া হয়নি। স্থানীয় নেতাদের একাংশের দাবি, টাকার বিনিময়ে সুবিধাবাদীদের শীর্ষ পদ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামী লীগের অনুসারীদের বসানো হচ্ছে, যার প্রমাণস্বরূপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি ছড়িয়ে পড়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে উপজেলা বিএনপি পূর্বঘোষিত সব ধরনের সম্মেলন স্থগিতের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি দেয়। তবে সেই আদেশ তোয়াক্কা না করে জেলা নেতাদের উপস্থিতিতে সম্মেলন আয়োজন করায় গভীর বিস্ময় ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নাঙ্গলকোট উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ্ব নজির আহমদ ভূঁইয়া।
তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল গফুর ভূঁইয়া। তাঁর দাবি, একটি নির্দিষ্ট পক্ষ ঘরে বসে তথাকথিত গায়েবি কমিটি ধরে রাখতে চাইছে। তারা রাজপথের রাজনীতিতে না এসে কেবল ঘরে বসে সংবাদ সম্মেলন ও অপপ্রচারে লিপ্ত।
অন্যদিকে সম্মেলন প্রক্রিয়ার সমর্থকদের দাবি, নিয়মতান্ত্রিকভাবেই তৃণমূল শক্তিশালী করার কাজ চলছে। স্থানীয় এক বিএনপি নেতা নজির আহমদ ভূঁইয়ার ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, নজির আহমেদ আগে ঘরে বসে কমিটি করলেও তখন কেউ প্রতিবাদ করেনি। এখন রাজপথে সম্মেলনের মাধ্যমে যোগ্যদের পদ দেওয়া হচ্ছে বলেই অনর্থক বিরোধীতা করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগকারীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ বাদ দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
এদিকে বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মাঝেই ঢালুয়া হাইস্কুল মাঠে ঢালুয়া ইউনিয়ন বিএনপির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অ্যাডভোকেট হামিদুল হক। অনুষ্ঠানে উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আব্দুল গফুর ভূঁইয়া।
সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাকারিয়া তাহের সুমন স্পষ্ট করে জানান, কোনো আওয়ামী ফ্যাসিস্ট বাহিনীর লোককে বিএনপির নতুন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। বিগত ১৭ বছর ধরে যাঁরা রাজপথে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, নতুন কমিটিতে তাঁদেরই গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আমিরুজ্জামান আমির। সহকারী অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিক ও ডা. শাহাব উদ্দিনের যৌথ সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক উদবাতুল বারী আবু, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি শোয়েব খন্দকার, নাঙ্গলকোট উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মজুমদার, বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক এনাম ভূঁইয়া এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব চৌধুরী।
সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মক্রবপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাজহারুল ইসলাম ছুফু, সাবেক কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন মুকুল, আলমগীর, মো. ফারুক হোসেন, মাওলানা নুরুল ইসলাম, ঢালুয়া হাইস্কুল সভাপতি মাহবুবুল হক লিটন, ইয়াছিন মিয়াজি, মাস্টার অহিদুর রহমান, যুবদল নেতা গিয়াস উদ্দিন ও শাহজাহান।
সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে পদগুলোতে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় সমঝোতার ভিত্তিতে সর্বসম্মতিক্রমে নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করা হয়। এতে সভাপতি পদে ইসহাক মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক পদে আজাদ হোসেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে বেলাল হোসেন ভূঁইয়া নির্বাচিত হন। একই দিনে উপজেলার মোট সাতটি ইউনিয়নের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
পকেট কমিটি, আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে নাঙ্গলকোট বিএনপি বর্তমানে মুখোমুখি অবস্থানে পৌঁছেছে। তবে মাঠপর্যায়ের সাধারণ নেতা-কর্মীদের দাবি একটাই—গঠনতন্ত্র মেনে স্বচ্ছ ভোটাভুটির মাধ্যমে দলের প্রকৃত ও ত্যাগী নেতাদের হাতেই দলের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হোক।
























