ঢাকা ১২:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সরকারি ঋণ, ব্যয় কমানোর তাগিদ আইএমএফের

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সরকারি ঋণ, ব্যয় কমানোর তাগিদ আইএমএফের

বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণের বোঝা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ক্রমবর্ধমান ঋণ, উচ্চ সুদহার ও বাজেট ঘাটতির ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোকে এখনই সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা চলাকালে প্রকাশিত সংস্থাটির ‘ফিসকাল মনিটর’ প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ বৈশ্বিক জিডিপির ৯৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। ঋণ বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে অন্যতম উচ্চ ঋণের পর্যায়ে পৌঁছাবে।

আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে আর্থিক ঝুঁকি ক্রমেই বাড়লেও অনেক দেশ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে না। সরকারি ঋণের উচ্চমাত্রা, সুদ পরিশোধের বাড়তি ব্যয় এবং বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয়ের চাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সংস্থাটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় অর্থনীতিগুলোতে ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত খাতে ব্যয়ের চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আইএমএফের মতে, ক্রমবর্ধমান ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে নিম্ন আয়ের দেশগুলো। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, এসব দেশে ঋণ পরিশোধের ব্যয় এক দশক আগে মোট রাজস্বের ৬ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

ফলে সরকারের আয়ের বড় একটি অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এতে দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

জর্জিয়েভা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ সুদহারের প্রভাব উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের অর্থনীতিতেও পড়ছে। বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার আশায় উচ্চ সুদের বাজারে অর্থ স্থানান্তর করায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ সংগ্রহ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

এ অবস্থায় নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য স্বল্পসুদে অর্থায়ন ও দুর্যোগকালীন ঋণ-স্বস্তির ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফ। বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা ট্রাস্ট (পিআরজিটি) এবং দুর্যোগকালীন ঋণ-স্বস্তি তহবিলের (সিসিআরটি) জন্য প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

আইএমএফের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এর প্রভাবে সুদহারও দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

এতে সরকারগুলোর ঋণ গ্রহণের ব্যয় বাড়বে এবং বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে যেসব দেশের আর্থিক পরিস্থিতি আগে থেকেই দুর্বল, তাদের বাজারের চাপ বাড়ার আগেই বাস্তবসম্মত ও পর্যায়ক্রমিক আর্থিক সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। এ জন্য সরকারি আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং বাজেট ঘাটতি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বুধবার ব্যাংককে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঋণের চাপ কমাতে সহায়তা করলেও প্রয়োজনীয় আর্থিক সমন্বয়ের বিকল্প হতে পারে না।

একই সঙ্গে চীনকে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জর্জিয়েভা।

আইএমএফ মনে করে, সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোর নয়। বড় অর্থনীতিগুলোর ঋণ ও বাজেট ঘাটতির প্রভাব আন্তর্জাতিক সুদহার, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং অন্যান্য দেশের অর্থায়ন পরিস্থিতির ওপরও পড়ে।

ঋণ ও বাজেট ঘাটতি কমাতে করব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬ সালের ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করের কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে রাজস্ব আয় ধরে রাখার পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

এ জন্য মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও করপোরেট করব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করা, কর অব্যাহতির কার্যকারিতা পর্যালোচনা এবং রাজস্ব সংগ্রহে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোন খাতে অর্থ ব্যয় বেশি সুফল দিচ্ছে, তা মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। তবে ব্যয় সংকোচনের নামে সামাজিক সুরক্ষা ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে।

আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস জানিয়েছেন, ছয় মাস আগের পূর্বাভাসের তুলনায় বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এক বছর আগের তুলনায়ও ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব করলে ভবিষ্যতে সরকারগুলোকে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রশাসক আলেক্সান্ডার ডে ক্রু জানিয়েছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যম পর্যায়ের অর্থনীতিগুলো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় গড়ে তিন গুণ বেশি সুদ পরিশোধ করছে।

এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাস্তবায়নযোগ্য উন্নয়ন প্রকল্প তৈরিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।

বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফের সতর্কবার্তা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। এসব আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফের সাধারণ সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়সীমা চূড়ান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সংস্থাটির মূল বার্তা হলো, শুধু ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ঋণের অর্থের কার্যকর ব্যবহার, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের যথাযথ ব্যবস্থাপনাই দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সরকারি ঋণ, ব্যয় কমানোর তাগিদ আইএমএফের

আপডেট সময় : ১১:৩৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণের বোঝা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ক্রমবর্ধমান ঋণ, উচ্চ সুদহার ও বাজেট ঘাটতির ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোকে এখনই সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা চলাকালে প্রকাশিত সংস্থাটির ‘ফিসকাল মনিটর’ প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ বৈশ্বিক জিডিপির ৯৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। ঋণ বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে অন্যতম উচ্চ ঋণের পর্যায়ে পৌঁছাবে।

আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে আর্থিক ঝুঁকি ক্রমেই বাড়লেও অনেক দেশ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে না। সরকারি ঋণের উচ্চমাত্রা, সুদ পরিশোধের বাড়তি ব্যয় এবং বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয়ের চাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সংস্থাটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় অর্থনীতিগুলোতে ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত খাতে ব্যয়ের চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আইএমএফের মতে, ক্রমবর্ধমান ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে নিম্ন আয়ের দেশগুলো। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, এসব দেশে ঋণ পরিশোধের ব্যয় এক দশক আগে মোট রাজস্বের ৬ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

ফলে সরকারের আয়ের বড় একটি অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এতে দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

জর্জিয়েভা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ সুদহারের প্রভাব উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের অর্থনীতিতেও পড়ছে। বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার আশায় উচ্চ সুদের বাজারে অর্থ স্থানান্তর করায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ সংগ্রহ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

এ অবস্থায় নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য স্বল্পসুদে অর্থায়ন ও দুর্যোগকালীন ঋণ-স্বস্তির ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফ। বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা ট্রাস্ট (পিআরজিটি) এবং দুর্যোগকালীন ঋণ-স্বস্তি তহবিলের (সিসিআরটি) জন্য প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

আইএমএফের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এর প্রভাবে সুদহারও দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

এতে সরকারগুলোর ঋণ গ্রহণের ব্যয় বাড়বে এবং বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে যেসব দেশের আর্থিক পরিস্থিতি আগে থেকেই দুর্বল, তাদের বাজারের চাপ বাড়ার আগেই বাস্তবসম্মত ও পর্যায়ক্রমিক আর্থিক সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। এ জন্য সরকারি আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং বাজেট ঘাটতি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বুধবার ব্যাংককে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঋণের চাপ কমাতে সহায়তা করলেও প্রয়োজনীয় আর্থিক সমন্বয়ের বিকল্প হতে পারে না।

একই সঙ্গে চীনকে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জর্জিয়েভা।

আইএমএফ মনে করে, সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোর নয়। বড় অর্থনীতিগুলোর ঋণ ও বাজেট ঘাটতির প্রভাব আন্তর্জাতিক সুদহার, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং অন্যান্য দেশের অর্থায়ন পরিস্থিতির ওপরও পড়ে।

ঋণ ও বাজেট ঘাটতি কমাতে করব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬ সালের ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করের কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে রাজস্ব আয় ধরে রাখার পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

এ জন্য মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও করপোরেট করব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করা, কর অব্যাহতির কার্যকারিতা পর্যালোচনা এবং রাজস্ব সংগ্রহে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোন খাতে অর্থ ব্যয় বেশি সুফল দিচ্ছে, তা মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। তবে ব্যয় সংকোচনের নামে সামাজিক সুরক্ষা ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে।

আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস জানিয়েছেন, ছয় মাস আগের পূর্বাভাসের তুলনায় বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এক বছর আগের তুলনায়ও ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব করলে ভবিষ্যতে সরকারগুলোকে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রশাসক আলেক্সান্ডার ডে ক্রু জানিয়েছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যম পর্যায়ের অর্থনীতিগুলো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় গড়ে তিন গুণ বেশি সুদ পরিশোধ করছে।

এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাস্তবায়নযোগ্য উন্নয়ন প্রকল্প তৈরিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।

বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফের সতর্কবার্তা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। এসব আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফের সাধারণ সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়সীমা চূড়ান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সংস্থাটির মূল বার্তা হলো, শুধু ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ঋণের অর্থের কার্যকর ব্যবহার, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের যথাযথ ব্যবস্থাপনাই দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।