ঢাকা ১২:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ থেকে আমানতের টাকা ফেরত দিচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক

আজ থেকে আমানতের টাকা ফেরত দিচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক

আর্থিক সংকটে থাকা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করছে। একই সঙ্গে সাধারণ গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করবে ব্যাংকটি। গত চার দিনে টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করা গ্রাহকেরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁদের আমানত ফেরত পাবেন।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা পেয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। তিন মাস মেয়াদি এই ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ।

তবে তারল্য সহায়তার অর্থ ব্যবহারে ন্যাশনাল ব্যাংককে ১১টি শর্ত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকটির সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের আমানত ফেরত না দেওয়া এবং নতুন কোনো ঋণ বিতরণে এই অর্থ ব্যবহার না করা।

গত সোমবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু জাফর জানিয়েছেন, ব্যাংকটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসার পর গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের চাপ অনেকটাই কমেছে। পাশাপাশি আমদানি কার্যক্রমও বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে ব্যাংকে জমা ও উত্তোলনের পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান নেই। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার থেকে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।

গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত টাকা উত্তোলনের আবেদন গ্রহণ করে ন্যাশনাল ব্যাংক।

ব্যাংক সূত্র জানায়, এই চার দিনে প্রায় ১১ হাজার গ্রাহক মোট দুই হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। দেশের বিভিন্ন শাখা থেকে গ্রাহকদের অর্থের চাহিদা প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেই অনুযায়ী শাখাগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে আবেদনকারী গ্রাহকদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে অন্য আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংক থেকে পাওয়া ৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে খরচ করতে পারবে না ন্যাশনাল ব্যাংক।

ধারের অর্থ পুরোপুরি পরিশোধ না করা পর্যন্ত ব্যাংকটি কোনো নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা বা বিতরণ করতে পারবে না। একই সঙ্গে সাবেক ও বর্তমান পরিচালক কিংবা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঋণ বা বিনিয়োগ করা যাবে না।

পরিচালকদের নামে বা বেনামে থাকা আমানত ফেরত দেওয়া, নতুন ঋণ বিতরণ, বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ বাড়ানো কিংবা আগে অনুমোদিত ঋণের অবিতরণকৃত অংশ ছাড় করতেও এই অর্থ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্য ব্যাংকের কাছে বিদ্যমান দায় পরিশোধ, আন্তব্যাংক প্লেসমেন্টের অর্থ ফেরত, অন্য ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগ অধিগ্রহণ এবং ফোর্সড ঋণ বা এলটিআরের বিপরীতে ঋণপত্রের দায় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার ক্ষেত্রেও এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। অন্য কোনো ব্যাংকে আমানত হিসেবেও রাখা যাবে না তারল্য সহায়তার টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও নির্দেশ দিয়েছে, গ্যারান্টি কার্যকর থাকা অবস্থায় নতুন করে সংগ্রহ করা আমানত শুধু ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সাধারণ আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে।

পাশাপাশি ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না। গ্যারান্টির আওতায় পাওয়া অর্থ পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ব্যবহার করা যাবে না।

তারল্য সহায়তার অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। বিপরীতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ২৩০ কোটি টাকায়।

ফলে ব্যাংকটির ঋণ ও আমানতের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৩২ শতাংশে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, একটি ব্যাংক প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৭ টাকা ঋণ বিতরণ করতে পারে।

অন্যদিকে গত জুন শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৬৬ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়ে।

সর্বশেষ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যান্য ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টির আওতায় নেওয়া ঋণ মিলিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ধারের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংক সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময়ে নানা আর্থিক অনিয়মের কারণে ব্যাংকটি বড় ধরনের লোকসান ও তারল্য সংকটে পড়ে। বর্তমানে ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আজ থেকে আমানতের টাকা ফেরত দিচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক

আপডেট সময় : ১১:৪১:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

আর্থিক সংকটে থাকা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করছে। একই সঙ্গে সাধারণ গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করবে ব্যাংকটি। গত চার দিনে টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করা গ্রাহকেরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁদের আমানত ফেরত পাবেন।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা পেয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। তিন মাস মেয়াদি এই ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ।

তবে তারল্য সহায়তার অর্থ ব্যবহারে ন্যাশনাল ব্যাংককে ১১টি শর্ত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকটির সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের আমানত ফেরত না দেওয়া এবং নতুন কোনো ঋণ বিতরণে এই অর্থ ব্যবহার না করা।

গত সোমবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু জাফর জানিয়েছেন, ব্যাংকটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসার পর গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের চাপ অনেকটাই কমেছে। পাশাপাশি আমদানি কার্যক্রমও বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে ব্যাংকে জমা ও উত্তোলনের পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান নেই। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার থেকে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।

গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত টাকা উত্তোলনের আবেদন গ্রহণ করে ন্যাশনাল ব্যাংক।

ব্যাংক সূত্র জানায়, এই চার দিনে প্রায় ১১ হাজার গ্রাহক মোট দুই হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। দেশের বিভিন্ন শাখা থেকে গ্রাহকদের অর্থের চাহিদা প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেই অনুযায়ী শাখাগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে আবেদনকারী গ্রাহকদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে অন্য আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংক থেকে পাওয়া ৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে খরচ করতে পারবে না ন্যাশনাল ব্যাংক।

ধারের অর্থ পুরোপুরি পরিশোধ না করা পর্যন্ত ব্যাংকটি কোনো নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা বা বিতরণ করতে পারবে না। একই সঙ্গে সাবেক ও বর্তমান পরিচালক কিংবা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঋণ বা বিনিয়োগ করা যাবে না।

পরিচালকদের নামে বা বেনামে থাকা আমানত ফেরত দেওয়া, নতুন ঋণ বিতরণ, বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ বাড়ানো কিংবা আগে অনুমোদিত ঋণের অবিতরণকৃত অংশ ছাড় করতেও এই অর্থ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্য ব্যাংকের কাছে বিদ্যমান দায় পরিশোধ, আন্তব্যাংক প্লেসমেন্টের অর্থ ফেরত, অন্য ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগ অধিগ্রহণ এবং ফোর্সড ঋণ বা এলটিআরের বিপরীতে ঋণপত্রের দায় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার ক্ষেত্রেও এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। অন্য কোনো ব্যাংকে আমানত হিসেবেও রাখা যাবে না তারল্য সহায়তার টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও নির্দেশ দিয়েছে, গ্যারান্টি কার্যকর থাকা অবস্থায় নতুন করে সংগ্রহ করা আমানত শুধু ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সাধারণ আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে।

পাশাপাশি ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না। গ্যারান্টির আওতায় পাওয়া অর্থ পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ব্যবহার করা যাবে না।

তারল্য সহায়তার অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। বিপরীতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ২৩০ কোটি টাকায়।

ফলে ব্যাংকটির ঋণ ও আমানতের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৩২ শতাংশে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, একটি ব্যাংক প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৭ টাকা ঋণ বিতরণ করতে পারে।

অন্যদিকে গত জুন শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৬৬ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়ে।

সর্বশেষ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যান্য ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টির আওতায় নেওয়া ঋণ মিলিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ধারের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংক সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময়ে নানা আর্থিক অনিয়মের কারণে ব্যাংকটি বড় ধরনের লোকসান ও তারল্য সংকটে পড়ে। বর্তমানে ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।